ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে কুষ্টিয়ার পদ্মা-গড়াইসহ পাঁচ নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পানি না পেয়ে শুকিয়ে গেছে পদ্মাসহ এর চারটি শাখা নদী। ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীব-বৈচিত্র ও পরিবেশের ওপর।
নদী অঞ্চলের জেলেসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ পেশা বদল করেও বেকার হয়ে পড়েছেন। পদ্মায় পানি না থাকায় শতশত কোটি টাকা ব্যয়ে কয়েক দফা গড়াই নদী খনন করা হলেও তেমন কোনো সুফল আসেনি।
বর্ষা গেলেই চরের বালি আবার নদীতে নেমে গিয়ে ভরাট হচ্ছে নদী। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, রুগ্ন পদ্মা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়সহ গড়াই নদীতে জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই জেগে ওঠা এসব চরে কৃষকরা ধানসহ আবাদ করছেন অন্যান্য ফসল। এছাড়া এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মার ব্যাপক অঞ্চলও একেবারেই শুকিয়ে গেছে।
পদ্মা নদীর শাখা হিসেবে গড়াই, হিসনা, কালীগঙ্গা ও মাথাভাঙ্গা নদীগুলো প্রায় পুরোপুরিই শুকিয়ে গেছে। পদ্মায় পানি শূন্যতার কারণে কৃষিক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয়ঘটেছে।
সুত্র জানায়, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা নদীর পানি ভাগাভাগির লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৩০ বছর মেয়াদি পানি চুক্তি করে ভারত সরকারের সঙ্গে।
চুক্তির ১৯ বছর পার হলেও কখনই হিস্যা অনুযায়ী পানি পায়নি বাংলাদেশ। অথচ যৌথ নদী কমিশনের ওয়েবসাইটে চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ১০ই এপ্রিল পর্যন্ত ১০ চক্রে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৪৭৯ কিউসেক পানি ভারত সরকার বেশি দিয়েছে বলে দাবি করা হলেও পানি নেই পদ্মায়।
পানির অভাবেই দিন দিন আরও শুকিয়ে যাচ্ছে পদ্মা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৫টি গার্ডারের মধ্যে অর্ধেকই এখন দাঁড়িয়ে আছে ধু-ধু বালুচরে। পানিউন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী ১লা জানুয়ারি থেকে ৩০শে মে পর্যন্ত সময়কে শুষ্ক মওসুম হিসেবে অভিহিত করে প্রতিটি মাসকে তিন চক্রে ভাগ করা হয়েছে। কোন চক্রে বাংলাদেশ কি পরিমাণ পানি পাবে তাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
ঠিকমতো পানি বণ্টন হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সদস্যরা বাংলাদেশ-ভারত সফর করেন। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সব সময়ই ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পানি না পেয়ে পদ্মা আজ মরা খালে পরিণত হয়েছে। ফলে চলতি শুষ্ক মওসুমে পদ্মার বুকে দেখা দিয়েছে ধু-ধু বালুচর। অন্যদিকে শুষ্ক মওসুমে পানির অভাবে বন্ধ হয়ে যায় দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ লাখ একর সেচ সরবরাহ করার কথা থাকলেও পানির অভাবে এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকাসহ উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে। আর বিস্তীর্ণ এ এলাকায় মরুকরণ প্রক্রিয়ায় তীব্রতর হচ্ছে। জানা যায়, ১৯৬১ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরু করে ১৯৭০ সালে কাজ শেষ করে। ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফারাক্কা বাঁধের সবকটি গেট খুলে দিলে সেবারই মূলত চাহিদা অনুযায়ী পানি পেয়েছিল বাংলাদেশ।
১৯৭৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চাহিদানুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছে দেশটি। অথচ ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের আগে শুষ্ক মৌসুমেও পদ্মা থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি পাওয়া যেত। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকৌশলী ওবায়দুর রহমান জানান, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে পদ্মায় পানি হ্রাস এবং গড়াইসহ চারটি শাখা নদী শুকিয়ে গেছে।
পরিবেশবিদ ও গবেষক ড. আনোয়ারুল করিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী পানি পাচ্ছেনা। যে কারণে শুষ্ক মৌসুমে কুষ্টিয়াসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৫টি নদী পানি শুন্য হয়ে পড়ছে। পানিতে লবণাক্ততা দেখা দিচ্ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এসব অঞ্চলে মরুকরণ হওয়ার উপক্রম হতে বসেছে।
পরিবেশের উপর মারাত্মকবিপর্যয় নেমে এসেছে। এ অবস্থা থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো এবং পরিবেশের ভারসাম্য ধরে রাখতে হলে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী বলে মনে করেন এই পরিবেশবিদ। তিনি অবিলম্বে পানি চুক্তির ন্যায্য হিস্যা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি তাগিদ দেন।
এআই





