সাগর উত্তাল থাকায় ও বন্দরে তিন নম্বর সতর্কসংকেত দেখানোয় টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ আছে। নিজ উদ্যোগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে আজ শনিবার ৬৪০ পর্যটক টেকনাফে ফিরে এসেছেন। তবে এখনো সেন্ট মার্টিনে প্রায় ৮৫০ জন পর্যটক আটকা পড়েছেন।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সঞ্চালনশীল মেঘমালার কারণে গতকাল শুক্রবার থেকে সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কোনো ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে উপজেলা প্রশাসন গতকাল সকাল থেকে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ কারণে কোনো পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যেতে কিংবা ফিরতে পারেননি।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টায় পাঁচ হাজারের বেশি পর্যটক ৭টি জাহাজ ও ১৭টি ট্রলারে করে টেকনাফ থেকে ৩৪ কিলোমিটার দূরের সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে যান। ওই দিন বিকেলে ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক টেকনাফ ফিরে এলেও অবশিষ্ট দেড় হাজার পর্যটক দ্বীপে থেকে যান। কিন্তু গতকাল বন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখানো হলে আটকা পড়েন তাঁরা। আজ বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ১৫টি স্পিড বোট (প্রতিটিতে আটজন করে ১২০) ও ১৩টি ট্রলারে (প্রতিটিতে ৪০ জন করে ৫২০) ৬৪০ পর্যটক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টেকনাফে ফিরে এসেছেন। এখনো ওই দ্বীপে সাড়ে আট শতাধিক পর্যটক দ্বীপে আটকা রয়েছেন।
টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রী পারাপারের নিয়োজিত সার্ভিস বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ছৈয়দ আলম বলেন, সেন্ট মার্টিনে আটকা পড়া পর্যটকেরা যেন হয়রানির শিকার না হন, এ কারণে সুলভ মূল্যে জনপ্রতি ১৫০ টাকা ভাড়া নিয়ে ১৫টি স্পিডবোট ও ১৩টি ট্রলারে করে ৬৪০ পর্যটককে টেকনাফ পৌঁছে দেওয়া ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখনো কয়েক শ পর্যটক সেন্ট মার্টিনে আটকা রয়েছেন।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, টানা দুই দিন ধরে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপে সাড়ে আট শতাধিক পর্যটক আটকা রয়েছেন। আজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৬৪০ পর্যটক কয়েকটি ট্রলার ও স্পিডবোটে টেকনাফ ফিরে গেছেন।
চট্টগ্রামের কর্নেলহাট থেকে ভ্রমণে আসা কলেজছাত্র মুজিবুর রহমান বলেন, ‘জীবনে আর কখনো সেন্ট মার্টিন আসব না। নিরুপায় হয়ে ট্রলার নিয়ে যখন ৪০ জন পর্যটক সেন্ট মার্টিন থেকে টেকনাফের উদ্দেশে রওনা দিই। সাগরের মাঝে আসার পর বিশাল ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারটি একবার পানির নিচে চলে যাচ্ছে, আবার উঠে যাচ্ছে। ট্রলারটি উল্টে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। বলতে গেলে মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। ভয়ে অনেক নারী, শিশু ও পুরুষ কান্নাকাটি ও বমি করেছেন।’
ঢাকার আশকোনা থেকে আসা সুলতান মাহমুদ বলেন, অনেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কবলে পড়ে আটকা পড়ায় টাকা শেষ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দ্বীপের আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে গলা কাটা বাণিজ্য চালালেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
পর্যটকবাহী জাহাজ কেয়ারি সিন্দাবাদের টেকনাফের ব্যবস্থাপক শাহ আলম বলেন, সতর্কসংকেত বলবৎ থাকায় আজ কোনো জাহাজ সেন্ট মার্টিন যেতে পারেনি। সতর্কসংকেত কেটে গেলে আটকে পড়া পর্যটকদের ফিরিয়ে আনতে জাহাজ পাঠানো হবে।
কোস্টগার্ড সেন্ট মার্টিন স্টেশনের দায়িত্বে থাকা কমান্ডার সাব-লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ আবুল হাশেম বলেন, ‘আজ ট্রলারে করে কিছু পর্যটক সেন্ট মার্টিন ছেড়ে গেছে শোনার পর থেকে আর কোনো ট্রলারকে ছেড়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। সাগর শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আর কোনো পর্যটককে ভ্রমণের নামে ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে পারি না।’
কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকা ও সমুদ্রবন্দরের ওপর দিয়ে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শফিউল আলম বলেন, ঝুঁকি নিয়ে না আসার জন্য নির্দেশ দেওয়ার পরও সেন্ট মার্টিনে আটকা পড়া পর্যটকেরা ট্রলারে করে টেকনাফে ফিরেছেন। যাঁরা দ্বীপে এখনো আটকা রয়েছেন, তাঁদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাইন উদ্দিন খান বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেন্ট মার্টিনে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জারিফ





