প্রকৃতির দান অমূল্য সম্পদ বায়ু। বায়ু ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। অমূল্য এ পদার্থ যেমন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে,তেমনি বায়ুই হতে পরে মানুষের মৃত্যুর কারণ। যদি তা হয় দূষিত। কিন্তু প্রতিনিয়ত মানুষই বায়ু দূষিত করে থাকে। জেনে অথবা না জেনে এই আত্মঘাতী কাজটি করে যাচ্ছেন কোনো কোনো গোষ্ঠী।
বায়ুর অ্যতম উপাদান অক্সিজেন মানুষ গ্রহণ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে। গাছপালা কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ত্যাগ করে।
অর্থাৎ মানুষের জন্য বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড তা গ্রহণ করে নেয় গাছ। এজন্য অধিক অক্সিজেনের জন্য অধিক গাছপালার প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে গাছপালা কেটে উজাড় করা হচ্ছে। দিন দিন কমে যাচ্ছে বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ। একই সঙ্গে বায়ু দূষণের মাত্রাও বাড়ছে। গাড়ি,লঞ্চ-স্টিমারের কালো ধোঁয়া, কলকারখানার কালো ধোঁয়া ও বর্জ্য বায়ুকে দূষিত করছে।[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1399102281.jpg[/img]
ঘণবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ। যানবাহনের সংখ্যাও ব্যাপক হারে বেড়েছে। এগুলো প্রতিনিয়ত কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। যা নির্মল বায়ুকে দূষিত করছে। পাশাপাশি ইট পোড়ানোয় নির্গত কালো ধোঁয়া এজন্য দায়ী।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ হলেও বায়ুদূষণের দিক থেকে এ দেশের স্থান শীর্ষে। ইয়েল ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে,বিশ্বে ভারতের পর বাংলাদেশের বাতাস সবচেয়ে বিষাক্ত। পরিচালিত সমীক্ষায় বিশুদ্ধ বাতাসের বিশ্লেষণে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে ভারত পেয়েছে ৩ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট,বাংলাদেশ পেয়েছে ১৩ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট। বাতাস দূষিত হওয়ার কারণ হিসেবে যদি শিল্প-কারখানাকে দায়ী করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান এত নিচে হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, বাংলাদেশে শিল্প-কারখানার পরিমাণ চীন কিংবা ভারতের সঙ্গে তুল্য নয়। সংগত কারণেই বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে গাড়ির ধোঁয়া, ইটখোলা ইত্যাদিকে দায়ী করতে হয়। তবে এ মুহূর্তে দেশের এ দুরবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন।[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1399102352.jpg[/img]
ঢাকা শহরে প্রায় এক কোটির অধিক লোকের বাস। বিপুল জনসংখ্যাও বায়ু দূষণের কারণ। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখায় তা পচে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায়। নির্মল বায়ুর জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশের দাবি উঠেছে সর্বমহল থেকে। পরিবেশবিদরা শহর থেকে ত্রুটিযুক্ত যানবাহন তুলে দেওয়ার দাবিটি অব্যাহত রেখেছে। সরকারও এসব যানবাহন তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে সফল হননি।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে,বায়ু দূষণের দিক থেকে ঢাকা শহর বিশ্বের অন্য যে কোনো বড় শহরের চেয়ে অনেক বেশি। এখানকার বাতাসে এত বেশি দূষিত পদার্থ মিশে আছে যে,যে কোনো সাধারণ মানুষই রাজপথে হাঁটতে গেলে টের পাবেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী,ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চলাচল করে। এগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া মূলত অদগ্ধ কার্বণ যা ছোট ছোট কণার আকারে নির্গত হয়। ঢাকার বায়ুতে সীসার কণার উপস্থিতি ব্যাপকতর বলে উল্লেখ করেছেন অনেক পরিবেশবিদ।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1399102655.jpg[/img]
তারা ত্রুটিযুক্ত যানবাহন চলাচলের ওপর জোর আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, যানবাহনের নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢাকা নগরবাসী বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে জানা যায়,ঢাকা শহরে প্রতিবছর বায়ু দূষণের কারণে ১৫ হাজার মানুষ অকালে মারা যায় এবং ৬৫ লাখ মানুষ মারাত্মক অসুস্থতা, ৮৫ লাখ মানুষকে ছোট-খাটো অসুস্থতার শিকার হয়।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1399102508.jpg[/img]
বিশ্বব্যাংক এবং ইসম্যাপ পরিচালিত দ্য ঢাকা অটো ক্লিনিক প্রোগ্রাম শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়,বায়ু দূষণের মারাত্মক ফল স্বরূপ। গত ৮ বছরেই মৃত্যুবরণ করেছে ৮ হাজার ১৩৯ জন এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছে ২২ লাখ ২১ হাজার ৬৩৮জন। এদের মধ্যে ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৩৯জন। একই রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫৬ জন এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন আরো ১১ হাজার ৪৭৪ জন।
গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রাকে মারাত্মক বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দূষণের ক্ষেত্রে ঢাকাকে উল্লেখযোগ্য বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। গবেষণায় ঢাকার সাথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বায়ূ দূষনের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়,ঢাকার বাতাসে বায়ু দূষণের হার ৫০ দশমিক আর আর্ন্তাতিক স্ট্যান্ডার্ড হলো ১৫ (ইএডি)।
নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত ইটখোলাগুলির ব্যাপারে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ থেকে অভিযোগ উত্থাপন করা সত্ত্বেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এলাকার প্রভাবশালী মহল ইটখোলার মালিকানায় জড়িত থাকাতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1399102612.jpg[/img]
বাংলাদেশে বায়ু দূষণের সমীক্ষা চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল হুসাম দেখেছেন যে,বেবিট্যাক্সি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় উদ্বায়ী জৈব যৌগের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৭ গুণ বেশি। তিনি বলেছেন,বেবিট্যাক্সি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় ক্যান্সার সৃষ্টিকারী টোলুইনের সন্ধান পাওয়া গেছে। টোলুইনের মাত্রার সীমা হচ্ছে প্রতি ঘনমিটারে ২০০০ মাইক্রোগ্রাম। অথচ সেখানে বেবি ট্যাক্সির ধোঁয়ায় পাওয়াগেছে প্রায় প্রতি ঘনমিটারে দুই লাখ মাইক্রোগ্রাম।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1399102461.jpg[/img]
ঢাকা শরহ থেকে বেবিট্যাক্সি তুলে দেওয়ার পর ও সমাধান হয়নি। বাস,ট্রাক ও অন্য যানবাহনের কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে সারা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কালো ধোঁয়া ও ধূলিকণাযুক্ত দূষিত বায়ু থেকে মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। রাস্তায় মাক্স না বেঁধে হাঁটা যায় না। তাছাড়া কতক্ষণ হাঁটলেই চোখ দিয়ে দর দর করে পানি পড়তে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। এর কারণ শ্বাসনালিতে দূষিত সীসাযুক্ত বায়ু গিয়ে ঘা বা ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এ কারণে ঢাকায় প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের হার বেড়ে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন শিশু চিকিৎসকরা। গর্ভবতী নারীদের শরীরে সিসা প্রবেশ করলে নবজাতক শিশু সেই সীসা শরীরে নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। এ কারণে আগামীতে ঢাকা শহরে প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মের হার বেড়ে যাবে।
[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201405/1399102558.jpg[/img]
কারণ,বায়ুতে অতিরিক্ত সীসা দূষণ হওয়ায় সদ্যজাত শিশুর দেহে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং এর ফলে তাদের রক্তে সীসার পরিমাণ বেড়ে যায়। এতে বস্তি ও ঘণবসতিপূর্ণ এলাকার শিশুদের রোধ শক্তির ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব পড়ছে। ফলে এসকল এলাকার শিশুদের বুদ্ধিসত্তা হ্রাস পাচ্ছে। জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়,খুলনা,চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় বায়ু দূষণ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কোনো কোনো এলাকায় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ এমনকি আরো বেশি দূষিত বায়ুর নমুনা সংগ্রহ করেছে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তর। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের কালো ধোঁয়া,ইটের ভাটা এবং শিল্পকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বস্তুকণা এই দুষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে সরকার অবিলম্বে বায়ুকে দূষণমুক্ত করার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নেবে এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নতুন লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে পুরোনো মডেলের কোনো গাড়িকে লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়িকে সিএনজি চালিত গাড়িতে রূপান্তরের জন্যে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হবে। তাহলেই দেশ ভয়াবহ বায়ুদূষণের কবল থেকে পরিত্রাণ পাবে বলে আশা করেন পরিবেশবিদরা।
[b]ঢাকা, ৩ মে (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেএ[/b]