দিনাজপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলায় সরকারের ১০টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয় কর্মসুচীতে হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা প্রনয়ন ও চাল বিতরণে নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে খোলা বাজারে চাল বিক্রি ও চাল আত্মসাতের অভিযোগে ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযুক্তরা বেশির ভাগই সরকারী দলের নেতা কর্মী বলে জানা গেছে।

জেলার বীরগঞ্জ উপজেলায় গত ৪ তারিখ মঙ্গলবারে স্বল্পমূল্যের হত-দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারী চাল বাজারে বিক্রয়ের সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার চাল বিক্রেতা ও ডিলার সহ ২ জনকে আটক করে থানায় সোপর্দ্দ করেছে, এবং থানায় মামলা দায়ে করা হয়েছে।

বীরগঞ্জ থানার এজাহার সুত্রে জানাযায়, উপজেলার সাতোর ইউনিয়নের ২৫ মাইল বাজারে সরকারের বরাদ্দকৃত হত দরিদ্রদের জন্য সল্পমূল্যের চাউল বাজারের মুদি ব্যবস্যায়ী আব্দুর রৌফ এর পুত্র মোঃ রুস্তোম আলী বিক্রয় করে।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলম হোসেন ৪ অক্টেবর মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় বীরগঞ্জ থানার এসআই আযম প্রধানের সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে ৪ বস্তা চাউল আটক করে। এসময় চাউল বিক্রির দায়ে লক্ষিপুর গ্রামের শরৎ চন্দ্র রায়ের পুত্র ডিলার কামিনী রায় (৫০) বিক্রেতা রুস্তোম আলী (৪৫)কে আটক করে থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ্দ করে।

রাত্রী ১২টায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের খাদ্য পরিদর্শক মোঃ এনামুল হক বাদী হয়ে আটককৃত ২ জন ও পলাতক ২ জন ওয়ার্ড সদস্যকে আসামী করে বীরগঞ্জ থানায় ১টি মামলা দায়ে করে।

জেলার খানসামা উপজেলার ৬নং গোয়ালডিহি ইউপি’র দুবলিয়া গ্রামে ক্যানেলের বাজারে “খাদ্যবান্ধব” কর্মসূচীর আওতায় দুস্থ মানুষের মাঝে ১০টাকা কেজি দরে কার্ডের মাধ্যমে চাল বিক্রয়ের ডিলার পুনিল চন্দ্র রায় ৮বস্তা চাল আত্মসাৎ করে বাড়িতে রাখার সময় খানসামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজেবুর রহমানের তদারকীতে ধরা পড়লে ডিলারকে গ্রেফতার করে চৌকিদার এর মাধ্যমে থানায় সোর্পদ্দ করা হয়।

উল্লেখ্য যে, পুলিন চন্দ্র উক্ত ইউপি’র ৮নং ওয়ার্ডের আওয়ামীলীগের ওয়ার্ড সভাপতি। এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কামরুজ্জামান বাদী হয়ে খানসামায় থানায় রাতে ডিলার পুলিন চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে ৮বস্তা সরকারি চাল আত্মসাৎ এর অপরাধে ৪০৯ দন্ডবিধি তৎসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ এ্যাক্ট ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় মামলা করা করেন। মামলা নং- ০২/৯৮; তাং- ০৩/১০/২০১৬ ইং। একই সাথে ডিলারসীপ বাতিল করে গত ৪ অক্টোবর সকাল ১০টার সময় ডিলারকে খানসামা থানা পুলিশ জেল হাজতে প্রেরণ করেন।

এদিকে বিরল উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বরাবর লিখিত অভিযোগে এলাকাবাসী বলেন, ১১নং পলাশবাড়ী ইউনিয়নের নিয়োগকৃত ডিলার হেলাল হোসেন প্রথম পর্যায়ে গত ০৬.০৯.১৬ইং তারিখে, ডিও নং-০৫৩০৩২৭৬, পরিমান ৬৮১০ কেজি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২২/০৯/১৬ইং তারিখে ডিও নং-৫৩০৩৭০২, পরিমান-৬৮১০ কেজি চাল মোট ১৩ হাজার ৬২০ কেজি চাল এলএসডি থেকে উত্তোলন করেন।

প্রথম পর্যায়ে কিছু চাল বিতরন করলেও দ্বিতীয় পর্যায়ের চাল বিতরন না করে কালোবাজারে বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ করেছে। সরকার প্রদত্ত হতদরিদ্র মানুষের জন্য দেয়া চাল হতদরিদ্ররা পায়নি। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সুযোগ থেকে হতদরিদ্র পরিবার গুলো সম্পুর্ন বঞ্চিত হয়েছে। এলাকার গনমান্য ব্যাক্তিরা লিখিত অভিযোগে এই আত্মসাত ঘটনার জন্য ডিলার হেলাল হোসেনর দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি দাবী করেছেন এবং ডিলারশীপ বাতিলের দাবী জানান।

লিখিত অভিযোগে স্বাক্ষর করেছেন, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আহম্মেদ, মেম্বার আজহার আলী, আলহাজ্ব মোজাহারুল হক, ইউপি আলীগ সভাপতি পলাশবাড়ী বিরল দিনাজপুর। লিখিত অভিযোগের অনুলিপি দিয়েছে, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সংসদ সদস্য(বিরল-বোচাগঞ্জ)দিনাজপুর, জেলা প্রশাসক, দিনাজপুর, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন দপ্তরে।

এছাড়াও পার্বতীপুরের ১০ ইউনিয়নে ৩২ ডিলারের বেশিরভাগ সরকারী দলের নেতাকর্মী বলে স্থানীয়রা জানায়। উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের ২নং গোবিন্দপুর ওয়ার্ডের দক্ষিণপাড়ার আঃ মান্নান (কার্ড নং ১৫৩) ও তার ছেলে আবু তাহের (কার্ড নং ১৫৪) প্রায় ৫-৬ একর জমির মালিক। তার পরও বাবা ছেলে দু’জনেই কার্ড পেয়েছেন, চালও তুলেছেন। একই ইউনিয়নের হয়বৎপুর ওয়ার্ডের পরিস্থিতি। ২নং গোবিন্দপুর ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার ফাইজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার ওয়ার্ডে ৫টি মৌজায় ১৮টি পাড়া, কার্ডের বরাদ্দ ১৩১। কিন্তু ১৮ পাড়ার মধ্যে শুধুমাত্র শুড়িপাড়া ও ডাঙ্গাপাড়ায় এসব কার্ড বিতরন করা হয়েছে।

এছাড়া পরিবার প্রধানের নামে কার্ড দেয়ার নিয়ম থাকলেও এ দুই পাড়ায় অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের নামেও কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ইউপি মেম্বার ফাইজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, সরকারী নীতিমালায় হতদরিদ্রের তালিকা তৈরীতে ইউপি সদস্যকে অন্তর্ভূক্ত করার নিয়ম থাকলেও তাকে নেয়া হয়নি।

তার ওয়ার্ডে ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নুর আলম একাই হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা তৈরী করেছেন। মোমিনপুর ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরী ও চাল বিতরনে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব মন্ডল বলেন, কিছু কিছু এলাকায় ভুলক্রুটি ছিল, সেগুলো সংশোধন করে বর্তমানে সুন্দরভাবে চাল বিতরনের কাজ চলছে।

সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী হতদরিদ্র পরিবার প্রধানরা মাসে প্রতি কেজি ১০ টাকা দরে চাল পাবেন। এ চাল বিতরণী কার্যক্রমে প্রশাসন কে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হবার পরামর্শ দেন বিশিষ্টজনেরা।
এমবিএইচ