পাকিস্তান আমলে সবক্ষেত্রে বাঙালিরা চরম বৈষম্যর শিকার ছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

মঙ্গলবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আওয়ামী লীগের স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণে সব নির্দেশনা ছিল।

তিনি বলেন, বিএনপি বিশেষ একটি এজেন্সি ভাড়া করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতি খোজার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো কিছু পায়নি।

দীর্ঘ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে নানা সময় কী কী ষড়যন্ত্র হয়েছে উল্লেখ করে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তাকে গ্রেফতারের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘তখন অত্যাচার নির্যাতন করেছে বিএনপি সরকার। আর গ্রেফতার করা হলো আমাকে। কারা এই কাজ করেছে, তা আমি জানি। তাদের হিসাব নিকাশ পরে করব।’

বলেন, ‘এরপর আসল এমার্জেন্সি সরকার। দেখবেন, আমাকেই আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি তো সে সময় সরকারেও ছিলাম না। কারা করিয়েছে, সেটা এখন অন্তত জানি। সে হিসাব নিকাশ পরে নেব আমরা।’

বিএনপি সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিএনপি তখন নির্বাচনের মাঠে ছিল।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে ভোটের ১১ দিন আগে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। জারি হয় জরুরি অবস্থা, স্থগিত হয় সংবিধান।

পরে বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে গঠন করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর বিএনপি আমলে নিয়োগ পাওয়া সেনা প্রধান মঈন উ আহমেদ পেছন থেকে কলকাঠি নাড়াতেন বলে ধারণা করা হয়।

ওই আমলে দুই প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া-দুই জনকেই গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে প্রথমে গ্রেপ্তার হক আওয়ামী লীগ সভাপতি। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ধানমন্ডিতে সুধা সদন থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। ১১ মাস পর ২০০৮ সালের ১১ জুন মুক্তি পান তিনি।

দেড় মাসেরও বেশি সময় পর ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া। এক বছর আট দিন পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জামিনে মুক্তি পান।

সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর বদলে শেখ হাসিনাকে আগে গ্রেপ্তার করা নিয়ে সে সময় কথা উঠেছিল।

বিএনপি-জামায়াত জোটের সময়ের বিবরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা বাংলা ভাই সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের দেশে পরিণত করেছে। গ্রেনেড হামলা তো আছেই। এইভাবে অত্যাচার করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে তারা, ইতিহাসকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।’

২০০৮ সালের নির্বাচনেও যেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসতে পারে, তার জন্যও ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার গঠন করলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল, দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তুলব। যে মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করলেন, তারা ভিক্ষা করবে বা রিকশা চালাবে, এটা অপমানজনক। তাদের সন্তানেরা পড়ালেখার সুযোগ পাবে না, সেটা হতে পারে না। তাই আমরা ক্ষমতায় এসে তাদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করলাম। আমরা চেষ্টা করছি, সবার মধ্যে ইতিহাসকে ছড়িয়ে দেওয়ার। তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে উজ্জীবিত হচ্ছে, তারা সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। অথচ ইতিহাসকে মুখে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা জানে না, ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারে না।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ২০০৮ সালে সরকার গঠন করেছি। এরপর ২০১৩ সালে তারা এক দুর্বিষহ অবস্থা তৈরি করে। সেই অবস্থা আমরা সামাল দিয়েছি। ২০১৪ সালে আবার নির্বাচন হয়, মানুষের ভোটে ক্ষমতায় আসি। কিন্তু তারা ২০১৫ সালে অগ্নিসন্ত্রাস করে।

বিএনপি-জামায়াত সাড়ে ৩ হাজার মানুষ পুড়িয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাজার হাজার গাড়ি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে। সরকারি অফিসে আগুন দিয়েছে। কেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো-এটাই তাদের অন্তর্জ্বালা। তারা তো ক্ষমতায় থেকে ভোগ-বিলাস করেছে, মানি লন্ডারিং করে ধরা পড়েছে।

তিনি বলেন, তারা এতিম খানার টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করেছে। সবকিছু ধরা পড়েছে। এতে আমাদের কোনও হাত নেই। কিন্তু আদালত তাদের সাজা দিলে তারা মানে না। তারা কিছুই মানে না। তারা ক্ষমতায় থেকে মানুষকে হত্যা করেছে, এখনও তাই করতে চায়। দেশের কোনও উন্নয়ন তারা চোখেই দেখে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় আসার পর দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জাতির পিতা মাত্র সাড়ে ৩ বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে রূপ দেন। এর ৪৩ বছর পর আজ দেশ উন্নয়নশীল হয়েছে। আমরা জনগণের কল্যাণে কাজ করেছি। আমরা বাজেট বাড়িয়েছি, দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় বাড়িয়েছি।

এ সময় বিএনপি জোটের ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৫-০৬ অর্থবছরের বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের মেয়াদের একই খাতের বিভিন্ন তথ্যের তুলনা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, আমরা কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে জনগণের দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছি। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছি। মানুষ এখন সেবা পাচ্ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে, মানুষ কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে। এই স্যাটেলাইটের পর পর্যায়ক্রমে আরও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। আমরা মেট্রোরেল নির্মাণ করছি। আমরা ফ্লাইওভার তৈরি করেছি, হাইওয়েগুলো চার লেন করে দিচ্ছি। পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, আমাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই চ্যালেঞ্জ আমরা মোকাবিলা করছি।

এসএম