বিচারপতি মো: আবদুর রউফ সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মো: আবদুর রউফ বলেন, গুম, খুন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে মূল্যবোধের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই সাথে দেশের নাগরিকদের জান-মাল সহ মৌলিক অধিকার রক্ষায় প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও কার্যকর ভুমিকা পালন করতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ (Human Rights Development Society of Bangladesh) এর উদ্যোগে “৩০ আগষ্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস” উপলক্ষ্যে ঢাকায় “সাংবিধানিক মৌলিক মানবাধিকার এবং আইনের শাসন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ” শীর্ষক এক ভার্চুয়াল জাতীয় সেমিনারে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন।
দেশবরেণ্য সাংবাদিক, কলামিস্ট ও দৈনিক নয়াদিগন্তপত্রিকার সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিনের সভাপতিত্বে সেমিনারে সেমিনারে মুল প্রবন্ধ উপ¯’পন করেন বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট এর সাবেক মহাপরিচালক ও দৈনিক দিনকাল পত্রিকার সম্পাদক ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট ইউসুফ আলী’র সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ এর চীফ কো-অর্ডিনেটর এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মানবাধিকার সমন্বয় পরিষদ এর সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ. এম নোমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. বোরহান উদ্দিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সভাপতি আধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান, বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহবুবুল ইসলাম, লন্ডন বার ইউকে’র সলিসিটর ব্যারিস্টার রহমত আলী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এর সাবেক রেজিস্ট্রার ও সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ, বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো’র সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট ড. মো. শাহজাহান, দৈনিক নয়াদিগন্তপত্রিকার সিনিয়র নিউজ এডিটর মাসুমুর রহমান খলিলী, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও মানবাধিকার ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান এডভোকেট ড. গোলাম রহমান ভুঁইয়া, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) সেক্রেটারি শহিদুল ইসলাম সহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ।
সভাপতির বক্তব্যে আলমগীর মহিউদ্দিন বলেন, ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের কথা বলার অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সহ সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকার সমুহ রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। বিনা বিচারে আটক, হত্যা ও গুম পরিহার করে আইনের শাসন কায়েম করতে হবে।তিনি গুম হওয়া ব্যাক্তিদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং সরকারকে অবিলম্বে তাদের উদ্ধার ও স্বজনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আহবান জানান।
প্রবন্ধ উপস্থাপক ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী বলেন, সারা বছরের সঞ্চিত পুঞ্জিভুত হাহাকার, হতাশা, দুঃখ-বেদনা আর অতি ক্ষীন আশা বুকে নিয়ে স্বজন হারোনা পরিবারের সদস্যরা একবারই আসেন, ৩০ আগস্ট বিশ্বগুম দিবসে। জাতীয় প্রেস ক্লাব কিংবা তার আশেপাশে অশ্রু ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সমবেত হন। তাতে দেখা যায় কোন ছোট্ট শিশু তার পিতার ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে আছে মায়ের কোলে। মা ও শিশু স্তব্ধ পাষান। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। আমি আমার পিতাকে ফিরে পেতে চাই।
একই রকম ছবি দেখা যায় কোন কোন অশিতিপর প্রবীনের হাতে, চোখে অশ্রু নিয়ে আমি আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই প্ল্যাকার্ড হাতে। জীবিত না পাই, তবু তার লাশটা ফিরে পেতে চাই। শেষবার তাকে দেখে নিজেরাই তার দাফন সম্পন্ন করতে চাই। আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দাও। যাদের ছবি হাতে তারা আসেন, সেসব ছবি মানুষ সব গুম হয়ে গেছেন। কোন একদিন গভীর রাতে পোষাকে বা সাদা পোষাকে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা এসে তাদের জোর-জবরদস্তি তুলে নিয়ে গেছেন নির‚দ্দেশের দিকে। তারপর থেকে পরিবারের অধীর অপেক্ষা। কিš‘ তারা ফিরেননি। গুম হয়ে গেছেন। দেশে আজ গুম হওয়া শত শত মানুষ পাওয়া যায়। যদিওবা কেউ ফিরে এসে থাকেন, তবে তার চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে সারা জীবনের জন্য। ফিরে এসে কেউ আর মুখ খোলেননি।
সরকার সংবাদপত্রগুলোকেও থামিয়ে দিয়েছে। তারা যেতে পারেননি ভুক্ত ভোগী অপহৃতের কাছে। বের হয়নি কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
ফিরে এসেও যেন ফের গুম হয়ে গেছেন তারা। গুম হওয়া ব্যক্তি সম্পর্কে সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যে ভাষায় কথা বলেন, তাতে মনে হয় না তাদের ভেতরে মানবিকতা বলে কোন জিনিস আছে। কখনও সরকারি ভাষ্য সীমারের খঞ্জরের চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে থাকে। তিনি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে গুম হওয়া নিখোঁজ ব্যাক্তিদের স্বজনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদাত্ত আহবান জানান।
এডভোকেট ড. শাহজাহান বলেন, উচ্চ আদালত থেকে বারবার নির্দেশনা দেয়া হলেও নাগরিকদের ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করা হচ্ছে এবং তারা হয়রানির শিকার হচ্ছে।
স্বাগত বক্তব্যে এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন বলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষন করা হয়েছে, যা সংবিধানের আর্টিকেল ২৬, ২৭, ২৮ সহ বিভিন্ন স্থানে উলেখ রয়েছে। একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার বাস্ত বায়ন করা সেই দেশের সরকারের দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে দেশে গুম খুন হওয়ার মাত্র দেখে সাধারণ জনগণের মাঝে সব সময় ভীতির সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় দেশের সচেতন নাগরিক ও সুশিল সমাজকে সংগ্রাম করে হলেও স্বাধীন ভাবে বেঁছে থাকার নিশ্চয়তা বিধান তৈরি করা জরুরি।
এএস





