চুনতি বন এখন শুধু নামেই সীমাবদ্ধ। পুরনো বৃক্ষগুলো লোপাটের পাশাপাশি বনজুড়ে অ্যাকাশিয়ার বিস্তার বনের মৌলিক বাস্তুসংস্থানকে ঠেলে দিয়েছে হুমকির মুখে। পাশাপাশি বনের ভিতর অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও অবৈধ বসতি বনের স্থায়ী বিপদ ডেকে এনেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে বনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, বনের ভিতর ও আশপাশে বেশ কিছু বসতি গড়ে উঠেছে। কয়েকটি এলাকায় রীতিমতো গড়ে উঠেছে লোকালয়। তবে বনের সীমানাঘেঁষে পুরনো কিছু বসতি আগে থেকেই ছিল বলে জানা যায়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন নতুন বসতি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বন কর্মকর্তা জানান, মায়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনেকেই বর্তমানে চুনতি বনের বাসিন্দা। স্থানীয় একটি চক্র শরণার্থীদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে তাদের বনের ভেতর পুনর্বাসন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বনের একজন স্থায়ী বাসিন্দা দ্বিমত পোষণ করে বলেন, অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার পেছনে বনবিভাগের লোকজন সরাসরি জড়িত। সবচেয়ে বেশি অবৈধ বসতি রয়েছে হারবাং, চুনতি ও আজিজনগর এলাকায়। সেখানে প্রায় ৫০০ পরিবার অবৈধভাবে বনের জায়গায় বসবাস করছে। চুনতি মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা আবুল ফয়েজ জানান, বর্তমানে বনের প্রায় ২০০০ একর জায়গা বেদখল অবস্থায় রয়েছে।
বনের ভিতর বসবাসকারী এসব মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অধিকাংশ সময় বনের ওপরই নির্ভরশীল। বনকে ‘বনের মতো’ রাখার প্রধান শর্তই হলো বনের ভিতর যথাসম্ভব মানুষের আনাগোনা কম থাকার ব্যবস্থা রাখা। কারণ বন তো জীববৈচিত্র্যের বাসস্থান। সেখানে মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে বংশ পরম্পরায় যারা বনের বাসিন্দা তারা কখনই বনের ক্ষতি হবে এমন কোনো কাজ করে না।
বনের ভিতর বন বিভাগের বেশ কয়েকটি স্থাপনা দেখা গেছে। যার কোনো কোনোটির প্রয়োজনীয়তাও নেই। নির্মাণাধীন অবস্থায় দেখা গেছে একটি পর্যক্ষেণ টাওয়ার। পরিবেশবাদীদের মতে, বনের ভিতর পর্যক্ষেণ টাওয়ার তৈরির মাধ্যমে সেখানে পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও উসকে দেয়া হলো। অথচ সিলেটের বিখ্যাত জলারবন রাতারগুলেও একইভাবে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হয়ে তা বন্ধ করাতে সক্ষম হয়। এখানে কাজটি একেবারেই বিনা বাধায় হয়ে যাচ্ছে।
প্রকৃতি প্রেমিকরা মনে করেন, বনের ভিতর মানুষ অবশ্যই ঘুরতে যাবে, তবে সুশিক্ষিত হয়ে। বনকে ভালোবেসে, বনের ভাষা মনে ধারণ করে বনে প্রবেশ করাই উত্তম। তাই বনে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারের আগে তাদের আচরণগত নির্দেশনা বা সঠিক পরামর্শ জরুরি।
চুনতি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য মূলত ক্রান্তীয় মিশ্র চিরসবুজ বনের অংশ। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৭০ কিমি দক্ষিণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পশ্চিম পাশে লোহাগড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে চুনতির অবস্থান। অভয়ারণ্যটি চট্টগ্রামের বাঁশখালী, লোহাগড়া এবং কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার চুনতি, অধুনগর, হারবং, পুইছড়ি, বাঁশখালী, বড়হাতিয়া এবং টইটং এলাকা নিয়ে গঠিত।
১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে এই অভয়রণ্যটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তার আগে এই বন চুনতি রিজার্ভ বনভূমি নামেই পরিচিত ছিল।
ঢাকা, ৫ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই





