স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও চাই; অবিলম্বে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ইনডেক্স নম্বর চাই; স্বীকৃতির সময় থেকে চাকরির বয়স গণনা করতে হবে; এমপিও প্রদানে কোন ধরণের অনিয়ম, পক্ষপাত এবং ঘুষ-দূর্নীতি চলবে না; স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও শেষ না হওয়া পযন্ত নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন নয়; এই পাচটি দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে চতুর্থ দিনের মত অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন নন-এমপিও শিক্ষক ও কর্মচারীগণ।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া আমরণ অনশননের চতুর্থ দিনে তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দাবির বিষয়ে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কুষ্টিয়ার আলহাজ্ব আব্দুল গণী, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিলকিস পারভিন, বরিশাল বানারী পাড়ার সৈয়দকাঠী ইসলামীয়া কলেজের রুনা খানম, টাঙ্গাইলের অভিরুন্নেসা মহিলা দাখিল মাদ্রাসার নাসিমা আক্তার।

শনিবার তাদের অবস্থা আশঙ্কা জনক হয়ে উঠলে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দেখা যায় আবার অনশনে অবস্থান নিলেও তাদের স্যালাইন দেয়া হচ্ছিল।

অনশনের অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরো অনেকেই। তার পরেও শিক্ষকগণ বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরে যাবেন না।

রোববার থেকে শুরু হওয়া অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকগণ দায়ীত্ব পালন করছেন, এভাবে ভাগ করে কিছু শিক্ষক আসছেন আবার কিছু শিক্ষক চলে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক অবস্থার যাতে কোন ব্যঘাত না ঘটে।

চট্টগ্রামের ফতেহাবাদ কলেজের শিক্ষক অমল কান্তি দে, তার বুকে-পিঠে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এমপিও দিয়ে জীবন বাঁচান। এমপিওবিহীন ১৫ বছর কী যে কষ্ট, কী যে যন্ত্রণা!’ এই ছোট্ট ক’টি বাক্য লিখা। তবে তারঁ মুখে কোন কথা নেই ছলছল চোখে কিছুক্ষণ পর পর আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন।

নাটোরের লালপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এণ্ড কলেজের মতিউর রহমান। ঢাকার বোরহান উদ্দিন কলেজ থেকে পাশ করেছেন। তার ছাত্র-ছাত্রীরা এখন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে।

সে দিন একজনের সাথে দেখা হলেই জানতে চাইলেন- ‘স্যার আপনার এখনও বেতন হয়নি’? ‘কেন যে শিক্ষকতাকে বেছে নিলেন’?

তিনি জানান, পরিবারে ছেলে-মেয়েদের বিভিন্ন চাহিদা থাকে। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্বেও পূরণ করতে পারি না। একদিন তো আমার বড় মেয়ে বলেই ফেলল, আপনি তো প্রতিদিন অফিসে যান কিন্তু টাকা আনেন না কেন ?

এভাবে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলছে মতিউরের মত আরো হাজার হাজার নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন। যাদের মধ্যে কারো চাকরী জীবন ১১ বছর কারো বা ১৩, ১৫, ১৮। তাদের প্রত্যেকের জীবনই যেন এক একটি ট্রাজেডি-মহাকাব্য।

আন্দোলনের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে অনশনরত শিক্ষকগণ বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে বোঝা গেছে, তিনি আমাদের জন্য কিছু করতে পারবেন না। কারণ এখন পর্যন্ত তিনি আমাদের সাথে কোন আলোচনায় আসেননি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতাই প্রত্যাশা করছি।

উল্লেখ্য, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘তাদের দাবির প্রতি আমাদের সমর্থন আছে’। ‘কিন্তু দাবি পূরণ করতে গেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি লাগবে’।

‘আর্থিক বরাদ্দ না পেলে দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়’। ‘আমরা তাদের অনুরোধ করছি, তারা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করে কষ্ট করবেন না। আমরা এজন্য কাজ করছি’।

দেশে বিভিন্ন পযায়ে ২১ লাখ চাকরিজীবীর বেতন বাড়ছে। বেতন বৃদ্ধির এই প্রেক্ষাপটে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারীদের দুঃখ-বঞ্চনা আরো বাড়ছে।

অবহেলা-বঞ্চনার শিকার হয়ে তারা বাধ্য হয়ে আন্দোলনে নামছে। শিক্ষামন্ত্রীর পক্ষ থেকে বার বার আশ্বাস দেয়া হলেও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে সে প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সাক্ষাতের চিঠি পেলেও অজ্ঞাত কারণে পরে সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রতিঘরে একজনকে সরকারী চাকরীর ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও নিজ যোগ্যতায় চাকরি নেয়া এসব শিক্ষকদের এমপিওভূক্তি করা হয়নি।

শিক্ষকগণের দাবি, সরকারের দায়ীত্ব হবে মাধ্যমিক স্তরের মুমূর্ষপ্রায় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা এবং অধিকার বঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিতকরণ ও বিশ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিও ভূক্তিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

এমএ/এসএইচ