ব্লগার হত্যাকাণ্ডে হেফাজতে ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম মনগড়া খবর প্রকাশ করছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ আহমদ শফীর পক্ষে তার প্রেস সচিব মাওলানা মুনির আহাম্মদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ অভিযোগ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, কতিপয় মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হেফাজতের দেওয়া ৮৪ জনের তালিকা ধরেই একে একে ব্লগার হত্যা করা হচ্ছে, মর্মে মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্লগার হত্যার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামকে জড়ানোর অপপ্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। এই অপপ্রয়াসের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী।

আল্লামা শফী বলেন, ‘আল্লাহ-রাসুলের বিরুদ্ধে অবমাননাকর কটূক্তি এবং ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে যেন মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সরকার কঠোর আইন পাস করে। যাতে ধর্মকে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে বিদ্বেষ, হিংসা, প্রতিশোধপরায়ণতা ও সহিংসতা জন্ম না নেয়। হেফাজতের ১৩ দফার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিরাজমান সুন্দর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান ও পারস্পরিক মমতাবোধটা যেন বিনষ্ট না হয়। এ কারণেই হেফাজতের ১৩ দফার প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশব্যাপী গণজোয়ার তৈরি হয়। হেফাজত কোনো অবস্থাতেই আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও সহিংস পরিস্থিতি সমর্থন করে না বলেই বারবার ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে।’

হেফাজতের আমির বলেন, ‘কারো ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ করা, ঘৃণা ছড়ানো, হেয় করা কোনো অবস্থাতেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়। যেমন স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার থাকা মানে অন্যের ধানখেত মাড়িয়ে যাওয়া নয়।’

বিবৃতিতে হেফাজতের আমির আরো বলেন, ‘২০১৩ সালের ৩১ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে যে ৮৪ জন ব্লগারের তালিকা দেওয়া হয়, তা মাসিক আল-বাইয়্যিনাত ও দৈনিক আল-ইহসান পত্রিকার সম্পাদক এবং আনজুমানে আল-বাইয়্যিনাতের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম আরিফের নেতৃত্বে দেওয়া হয়েছিল। তিনি হেফাজতে ইসলামের কেউ নন এবং উক্ত বৈঠকে হেফাজতের কোনো নেতা অংশগ্রহণ করেননি।

প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াসহ প্রায় সকল গণমাধ্যমে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৮৪ জন ব্লগারের তালিকা হেফাজত দিয়েছিল বলে যে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদী ও তাদের দোসররাই এমন মিথ্যাচারে জড়িত থাকতে পারে।

আমাদের ১৩ দফার অন্যতম দাবি ছিল- ধর্ম অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন পাস এবং সে আইনের আওতায় বিচারের মাধ্যমে তাদের শাস্তি দেওয়া। যাতে কেউ কোনো সম্প্রদায় বা ব্যক্তি বিশেষের অনুভূতিতে আঘাত হেনে দেশ ও সমাজে শান্তি বিনষ্ট করার অপপ্রয়াস চালাতে না পারে। বর্তমানে কতিপয় মহল থেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়ে থাকে।

কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতারও একটা সীমা আছে। অন্যের ধর্মবিশ্বাসকে কেউ হেয় করতে পারে না। অন্যের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে মশকরা করা যায় না। কারো ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ করা, ঘৃণা ছড়ানো কোনো অবস্থাতেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়। কেউ যদি কারো মাকে গালি দেয়, কারো কন্যাকে গালি দেয়, অবশ্যই এতে কঠোর প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে।

তাই আমরা দেশের শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি যে, কেউ যাতে অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে সহিংস কর্মকাণ্ডে কাউকে প্ররোচিত করতে না পারে। এর জন্য কঠোর আইন থাকা দরকার। সম্প্রতি পুলিশের আইজি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ব্লগারদের সীমা লঙ্ঘন না করতে এবং ধর্ম অবমাননামূলক উক্তি থেকে বিরত থাকার আহ্বানেই প্রমাণিত হয়, হেফাজতের দাবির যৌক্তিতা এখন তারাও উপলব্ধি করেন। চুরি বা ডাকাতির হাত থেকে সম্পদ রক্ষায় পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে বলার মানে চোর বা ডাকাতকে সমর্থন করা নয়।

হেফাজতে ইসলামসহ এ দেশের উলামা-মাশায়েখ, কওমী মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা শান্তিতে বিশ্বাসী। কারণ, ইসলাম আমাদের শান্তি, সাম্য, সহনশীলতা ও ইনসাফের শিক্ষা দেয়। আমরা কখনোই আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা কোনো ধরনের বিচারবহির্ভূত সহিংস কর্মকাণ্ড সমর্থন করি না। হেফাজতে ইসলাম খুন, গুম, অপহরণসহ সকল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে। আমরা সব সময় জনসাধারণকে অন্যায়, অপরাধ, জোর-জুলুম ও সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।

আমরা চাই, ব্লগার হত্যাসহ সব ধরনের বিচারবহির্ভূত সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি কেউ যাতে বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তি করে সহিংস কর্মকাণ্ডে অন্যকে প্ররোচিত করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন পাস করা হোক। সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যেমন কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন, তেমনি অন্যের ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত হেনে সহিংসতায় উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধেও সমান কঠোরতা জরুরি।’ 

ইসলাম অবমানা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত ব্লগারদের কিছু মিডিয়ায় বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও মুক্তমনা বলে পরিচিত করার প্রয়াসের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এটাও ধর্ম অবমাননাকারীদের প্ররোচিত করার শামিল। দেশের শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থে সরকারকে এসব বিষয়ে সতর্ক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।’

এএইচ