জাতিসংঘে যোগ দিতে আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারের জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশের বহুমুখী সফলতা ও অবদানের কথা তুলে ধরবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে ৬০ সদস্যের বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন।

অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি বুধবার সকালে বিশেষ বিমানে চড়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন। অধিবেশন শেষে ১ অক্টোবর নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী।

এ বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সাধারণ বিতর্কের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘The UN at 70 - A New Commitment to Action’। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত এবারের সাধারণ বিতর্ক (General Debate) অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে, ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবারের অধিবেশনের মূল আয়োজন ‘UN Summit for the Adoption of the Post-2015 Development Agenda’ অনুষ্ঠিত হবে। একে কেন্দ্র করে উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের পুরোটা সময়জুড়েই অসংখ্য নীতি-নির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন অর্থমন্ত্রী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

এ বছরের জাতিসংঘ সম্মেলনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ বছরই জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) সময়ের বিবেচনায় চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হবে।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ধারাবাহিকতায় এ বছর একগুচ্ছ নতুন, যুগান্তকারী ও উচ্চাভিলাষী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হবে।

এ বছরের শেষ দিকে প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে একটি কাঙ্ক্ষিত ও গঠনমূলক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে এবারের অধিবেশন একটি প্রয়োজনীয় পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আইএসসহ বিশ্বব্যাপী সহিংস জঙ্গি তৎপরতার উত্থান এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে লাখ লাখ বিদেশে আশ্রয়প্রত্যাশীদের সমস্যা সমাধানের বিষয়গুলো এবারের অধিবেশনে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় জাতিসংঘের অব্যাহত প্রাসঙ্গিকতা এবং নিরাপত্তা পরিষদসহ সংস্থাটির সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়টি এবারের অধিবেশনের আলোচনায় নিঃসন্দেহে একটি নতুন মাত্রা পাবে।’

‘এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনবে’ উল্লেখ করে আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘২০০০ সালে সহস্রাব্দ ঘোষণাপত্র বা Millennium Declaration অনুমোদনের সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী আটটি লক্ষ্যমাত্রা সংবলিত সহস্রাব্দ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তিনি সেই লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে কাজও করেন।

তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এমডিজি বাস্তবায়নে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে একটি বিরল নজির স্থাপন করেছে। গত সাড়ে ছয় বছরে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে এই উন্নয়নের চাকা আরও বেগবান হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘‘এমডিজির লক্ষ্যগুলো অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতেই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রধানমন্ত্রীকে একের পর এক সম্মানজনক স্বীকৃতি ও পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

সরকারপ্রধান হিসেবে ২০০০ সালের মিলেনিয়াম সামিটের পর এবারের ২০৩০ ‘Agenda for Sustainable Development’ অনুমোদনের ঐতিহাসিক মুহূর্তেও বাংলাদশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।’’

অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুরস্কার পাওয়া প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত করা হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ‘United Nations Environment Programme (UNEP)’ তাকে এই বিশেষ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে।

পাশাপাশি, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নির্মাণে যুগান্তকারী উদ্যোগের জন্য অন্য একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ‘International Telecommunication Union (ITU)’র ‘ICTs in Sustainable Development Award’-এ ভূষিত করা হবে।’’

আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আমি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা যেমন— সার্ক, ওআইসি, ন্যাম, জি-৭৭ ও চীন, কমনওয়েলথ, এশিয়ান কো-অপারেশন ডায়লগ ইত্যাদি সংস্থাসমূহের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশগ্রহণ করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বৈশ্বিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তিকে আরও সুসংহত করবে।

একই সঙ্গে জাতিসংঘের হাত ধরে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের বহুমুখী সফলতা ও অবদানের কথা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি:

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন। ২৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী ‘UN Summit for the Adoption of the Post-2015 Development Agenda’-এর প্লেনারি সেশনে বক্তব্য রাখবেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরবেন এবং এমডিজি অর্জনের সাফল্যের ধারায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার ও প্রত্যয়ের কথা পুনর্ব্যক্ত করবেন।

রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে সরকার ইতোমধ্যে যে কার্যক্রম শুরু করেছে, সে বিষয়েও তিনি আলোকপাত করবেন এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরবেন।

একই সামিটের অংশ হিসেবে ২৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘Fostering Sustainable Economic Growth, Transformation and Promoting Sustainable Consumption and Production’ শীর্ষক একটি ‘Interactive Dialogue’ সেশনে যৌথ-সভাপতিত্ব করবেন।

এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের অন্যতম সরকারপ্রধান হিসেবে তাকে এই বৈঠকে যৌথ-সভাপতিত্ব করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক বা ‘General Debate’ অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় বক্তব্য রাখবেন।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার আদায়, দারিদ্র্য দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা তুলে ধরবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে, তিনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন করবেন।

২৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগে ‘High-Level Summit on Peace Operations’ আয়োজন করা হয়েছে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারের ‘Summit’-এ প্রধানমন্ত্রীকে যৌথ সভাপতিত্ব করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তিনি ছাড়া অন্যান্যের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘ মহাসচিব এই ‘Summit’-এ যৌথ সভাপতিত্ব করবেন বলে কথা রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এ সব কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু অঙ্গীকার করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

২৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিংপিংয়ের আমন্ত্রণে ‘Global Leaders’ Meeting on Gender Equality and Women’s Empowerment’-এ অংশগ্রহণ করবেন।

এই বৈঠকে তিনি বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন, নারী শিক্ষার প্রসার, নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার সুরক্ষা এবং লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরে বক্তব্য দেবেন।

২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্যোগে আয়োজিত ‘Leaders’ Summit on Countering ISIL and Violent Extremism’-এ যোগ দেবেন।

২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ‘Moving from MDGs to SDGs: Bangladesh Experience and Expectations’ শীর্ষক একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই বৈঠকে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের শীর্ষপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের বাইরে প্রধানমন্ত্রী ২৫ সেপ্টেম্বর ‘World Leaders Forum at Columbia University-G Girls lead the Way’ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন।

একই দিন প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের ‘Business Council for International Understanding (BCIU)’-এর সঙ্গে বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা বিষয়ে মতবিনিময় করবেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশ থেকে একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল যোগ দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র/সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এ সব বৈঠকের তারিখ ও সময় নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এমকে