দেশব্যাপী ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনসহ বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া নির্দেশ দিয়েছে সরকার। গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দেশব্যাপী সমন্বিত এ অভিযান পরিচালনার এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করবেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।
আর মাসব্যাপী অভিযান পরিচালনা কার্যক্রম এবং এর অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে।
মঙ্গলবার বিকেলে এ সংক্রান্ত্র একটি পরিপত্র জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জেলা পর্যায়ে ‘খাদ্যে রাসয়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মিশ্রন নিরোধ অভিযান’ তদারকির জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্যকে উপদেষ্টা এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সভাপতি করে ২৯ সদস্যের এই কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিটিতে সদস্য হিসেবে আরও থাকবেন পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন। জেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ছাড়া এই কমিটিতে স্থানীয় কলেজ শিক্ষক উপজেলা পর্যায়ে নির্বাহী কর্মকর্তাও রয়েছেন এই কমিটিতে।
গত ২১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ৩য় সভায় উপস্থিত সদস্যরা ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ও বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে নিবিড় ও ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নির্দেশনা দেন। ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ পরিপত্র জারি করে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) ড. কামাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, অবিলম্বে দেশব্যাপী ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ও বিভিন্ন নাম সম্বলিত বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ‘খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মিশ্রণ নিরোধ অভিযান’ নামে একটি সমন্বিত ও ব্যাপকভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা হবে।
ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ও বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে অপরাধ দমন অভিযান পরিচালনা, আমদানি, রপ্তানি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং শাস্তি প্রদানে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, গবেষণা ও প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ, গণসংযোগ ও সচেতনতা বৃদ্ধি- এই চতুর্মুখী কৌশল সম্বলিত কার্যব্যবস্থা নির্ধারণ করে সুপরিকল্পিত ও সুসমন্বিতভাবে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এই অভিযানের আওতায় জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের গোপন তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মাসভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের বাজার, দোকান ও সংরক্ষণাগারে ব্যাপকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা পরিচালিত মোবাইল কোর্টের সংখ্যা, পরিচালিত অভিযানে রুজুকৃত মামলা ও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা, আদায়কৃত জরিমানার পরিমাণ, অভিযান পরিচালনায় কোনো সমস্যা থাকলে তার তথ্য এবং জনসংযোগ ও প্রচারণা সংক্রান্ত কার্যক্রমের সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ চতুর্মুখী কৌশল সম্বলিত কার্যব্যবস্থার প্রতিটিতে কি কি কার্যক্রম নেওয়া হয়ে এবং এর অগ্রগতি কতটুকু তা পৃথকভাবে উল্লেখ করে মাসিক প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের ৫ তারিখের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন।
জেলা থেকে প্রাপ্ত ফলমূল ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ও বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং কমিটি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে আইন-শৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং বিভাগীয় কমিশনারদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আইন-শৃংখলা সংক্রান্ত মাসিক সমন্বয় সভায় আলোচনা করতে হবে।
প্রতিটি জেলায় কার্যক্রম গ্রহণের পরিপূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মিশ্রণ নিরোধ অভিযানে’ কার্যক্রম শুরু করতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, মিডিয়া কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের সদস্যসহ সমাজের সব পর্যায়ের লোকজনকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বিভাগীয় কমিশনাররা জেলা পর্যায়ের কার্যক্রমের সংবাদ স্থানীয় ক্যাবল নেটওয়ার্ক/টিভি চ্যানেল এবং সম্ভব হলে জাতীয়ভাবে মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করবেন।
সভায় জেলার জাতীয় সংসদ সদস্যদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে এবং জেলার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে প্রধান অতিথি হিসাবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানাতে হবে। এ বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয় ও তথ্য অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
অভিযান সফল করার লক্ষ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে উপজেলাভিত্তিক নিয়োজিত করবেন।
পুলিশ সুপাররা এ উদ্দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা ও ফোর্সের সমন্বয়ে উপজেলাভিত্তিক কমপক্ষে একটি করে টিম আগে থেকেই গঠন করে ও প্রস্তুত রেখে সংশ্লিষ্ট সবাইকে লিখিতভাবে অবহিত করবেন।
খাদ্যদ্রব্য ও ফলমূলে ফরমালিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও ভেজাল মিশ্রণের কুফল ও ক্ষতিকারক দিকসমূহ এবং সরকার কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
কমিটির কার্য পরিধি
* ‘খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ও ভেজাল মিশ্রণ নিরোধ অভিযান’ কমিটির কার্য পরিধি নিয়মিতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও ফলমূলে ফরমালিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও ভেজাল মিশ্রণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাপের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
* নিয়মিত ও নিবিড়ভাবে এ বিষয়ক কার্যক্রম মনিটর করা ও প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিতে হবে।
* ফরমালিন/ভেজাল বিরোধী কার্যক্রম গ্রহণ ও অভিযান পরিচালনায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট বিষয়টি পাঠাতে হবে।
* পরিচালিত মোবাইল কোর্ট/অভিযান, রুজুকৃত মামলা ও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের সংখ্যা, আদায়কৃত জরিমানার পরিমাণ ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ চতুর্মুখী কৌশল সম্বলিত কার্যব্যবস্থার প্রতিটিতে কী কী কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে এবং এর অগ্রগতি কতটুকু তা পৃথকভাবে উল্লেখপূর্বক মাসিক প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিতভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রেরণ নিশ্চিত করতে হবে।
* কমিটি প্রতি মাসে কমপক্ষে এক বার সভায় মিলিত হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিটি মাসে একাধিক বারও সভায় মিলিত হতে পারবে।
* কমিটি প্রয়োজনবোধে যে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তিকে কো-অপ্ট করতে পারবে।
ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এএইচ





