বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার কালুরপাড় থেকে বারহাজার বরিয়ালী ভায়া কাজিরহাট স্লুইসগেট (ওয়াপদার খাল) পর্যন্ত সরকারি খালের মাঝে প্রায় আড়াই কিলোমিটর জায়গায় বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছে আগৈলঝাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা গোলাম মূর্তজা খান।

বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় ১০টি গ্রামের খাল পাড়ের বাসিন্দা শত শত পরিবারের দৈনন্দিন কাজ কর্মসহ দুই শ মৎসজীবি পরিবারের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। হুমকির মূখে রয়েছে ৭০ থেকে ৮০টি ইরি-বোরো প্রকল্পের ২৫ হাজার কৃষক পরিবার। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে সরকারি খালে বাঁধ দিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের অবৈধ মাছ চাষের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পূর্বে জনগণের খেদমতের কথা বলে ভোট প্রার্থনা করে নির্বচিত হয়ে নিজ স্বার্থে সরকারি খালে বাঁধ দিয়ে নেতার জনসেবার নমুনা প্রকাশ করেছে।

সরেজমিনে ভূক্তভোগী কৃষক, এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার কালুরপাড় থেকে বারহাজার বরিয়ালী ভায়া কাজিরহাট স্লুইসগেট পর্যন্ত খালের মাঝে প্রায় আড়াই কিলোমিটর এলাকা বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন আগৈলঝাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা গোলাম মূর্তজা খান। ওয়াপদার খাল হিসেবে পরিচিত খালটির পশ্চিমে নগরবাড়ি সরু খাঁনের বাড়ির সামনে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয় এবং প্রায় আড়াই কিলোমিটার পূর্বে অপর বাঁধটি নির্মাণ করেন প্রশান্ত ডাক্তারের বাড়ির সামনে।

নগরবাড়ি গ্রামের আনোয়ার বিশ্বাস, ঘোড়াপাড় গ্রামের পারুল রানী বলেন, ‘সরকারি খালের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাঁধ দুটি নির্মাণ করে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মূর্তজা মাছ চাষ শুরু করেন। বাঁধ দেয়ার সময় আমরা হাজার হাজার জনসাধারণ দুরবস্থার কথা বলে চেয়ারম্যানকে বাঁধ না দিতে অনুরোধ করি। অনুরোধ সত্ত্বেও আমাদের দাবি উপেক্ষা করে বাঁধ নির্মাণ করেন। খালে বাঁধ দিয়ে উপজেলা চেযারম্যানের মাছ চাষ করায় কৃষকসহ হাজার হাজার মানুষের সর্বনাশ ডেকে আা হয়েছে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, খালটির নগরবাড়ি এলাকার পশ্চিম মাথায় সরু খানের বাড়ির সামনে প্যালাসাইডিং করে মজবুত একটি বাঁধ দেয়া হয়। অপর বাঁধটি দেয়া হয় আড়াই কিলোমিটর পূর্বে পূর্বকাঠীরা প্রশান্ত ডাক্তারের বাড়ির সামনে। বাঁধের ফলে আড়াই কিলোমিটর দৈর্ঘ প্রায় ৩ থেকে ৪ শত মিটার প্রস্থ বিশাল মৎস্য খামার তৈরি করা হয়েছে। খালের মধ্যে মাচা করে তৈরি করা হয়েছে মুরগির খামার। বাঁধের আওতায় খালের দুই পাড়ে শত শত পরিবারের বাস।

স্থানীয়রা জানান, তাদের এলাকাটি বিল এলাকা ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় তেমন কোনো পুকুর নেই, নেই কোনো গভীর, অগভীর নলকুপ। খালের পানিই তাদের জীবিকা ও নিত্যনৈমত্তিক কাজে একমাত্র ভরসা।

রাহুতপাড়া গ্রামের মৃত বনমালী বালার পুত্র বৃদ্ধ শশী ভূষন বালা , নগড়রবাড়ি গ্রামের আনোয়ার হোসেনসহ অনেকেই বলেন, ‘ভাটা জোয়ারের পানিতে মোগো পূর্ব পুরুষরা ও মোরা গোসল করতাম, পানি খাইতাম, মাছ ধরতাম। এ্যাহন মোগো খালে নামতে দেয় না । এ্যাহন নাওন খাওনে মোরা পানির কষ্টে আছি। নেতারা সেবার কথা কইয়া ভোটে জয় পাইয়া হের শারতো (স্বার্থে) পাইতে মোগো দিক তাকাইতেছে না।’

গৈলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন লাল্টু বলেন, সরকারি খালটি বাঁধ দেয়ায় ৭০ থেকে ৮০টি বোরো প্রকল্প সেচ সংকটে পরেছে। বাঁধের আওতায় থাকা এলাকার ২৫ হাজার কৃষক পরিবার বোরো চাষের এক ফসলির ওপর নির্ভরশীল। বাঁধের ফলে তারা বোরো করতে না পারলে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপনসহ খাদ্যসংকট দেখা দিবে।

তিনি জনস্বার্থে বাঁধটি অপসারণের জন্য আহবান জানান। আগৈলঝাড়া উপসহকারী কৃষি অফিসার মো. খলিলুর রহমান বলেন, বাঁধটি অপসারণ করা না হলে আগামি বোরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।

অভিযোগের ব্যাপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা গোলাম মূর্তজা খান বলেন, 'বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের সাথে আমি সম্পৃক্ত না। একটি প্রকল্পের মাটি কাটার জন্য বাঁধ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এলাকার কতিপয় যুবক মাছ চাষ করেছে।' তিনি বিষয়টি পত্রিকায় না লেখার জন্য অনুরোধ জানান।

বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সুকুমার বিশ্বাস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘পরিবেশ আইনে কোনো জলাশয় ভরাট কিংবা কোনো খালে বাঁধ দেয়া যাবে না। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’

ঢাকা, ৪ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই