সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যহারএবং লোপাটের অভিযোগে বিভাগীয় মামলার বেশিরভাগই স্বজনপীতির কারণে শাস্তি হয় না। বিভাগীয় তদন্তেও অনিয়ম এবং স্বজনপীতির অভিযোগ উঠে।আর বিভাগীয়   তদন্তে অভিযুক্তরা সহজেই মাফ পেয়ে যায়।

আবার অনেক সময় অভিযোগ প্রমাণিত হলেও মানবিক বিষয়টি সামনে রেখে কৌশলে মাফ করে দেয়া হয়। এরপরও যদি কাউকে শাস্তি দিতে হলে তিরস্কার এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ১/২ বছর স্থগিত রাখার মধ্যে সাজা শেষ।

ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা তদন্তে পৃথক ‘স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষে’র মাধ্যমে হলে এ ধরনের অভিযোগ কমবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।

জানা যায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিব (সচিবদের) সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় বিদ্যমান পদ্ধতির পরিবর্তে নিরপেক্ষতার স্বার্থে একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিভাগীয় মামলার তদন্ত পরিচালনার সম্ভাব্যতা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরীক্ষা করে দেখতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতি বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশ গেজেটে’ প্রকাশিত বিভাগীয় মামলার রায় বা সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ‘বাংলাদেশ গেজেটে’র বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়।

প্রকাশিত‘বাংলাদেশ গেজেটে’ দেখা যায়, শিক্ষা ছুটি বা অন্য কোনো কারণে বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফেরেননি বা অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির জন্য বিভাগীয় মামলায় নোটিশ দেয়ার পর যারা উপস্থিত হন না বা বিদেশে থাকায় আর চাকরি করতে আগ্রহী নন। কেবল মাত্র তাদেরই চাকরিচ্যুতির মতো গুরুদন্ড হয়ে থাকে।

সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি ও অসদাচরণের মতো ঘটনার প্রবণতা বৃদ্ধির   প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষতার স্বার্থে একটি সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলার তদন্ত স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষের দ্বারা করার কথা সরকারের ভাবনায় এসেছে। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে রুজুকৃত বিভাগীয় মামলার তদন্ত কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর কর্তৃক পরিচালনা করছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিববৃন্দ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মতামত ও সুপারিশের প্রেক্ষিতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পরিদর্শনকালে প্রদত্ত নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিতভাবে প্রতিবেদন পাঠাবে।

প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আর্থিক সাহায্য প্রাপ্তির আবেদনসমূহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর পূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ আবেদনকারীর অসুস্থতার ধরণ, অসুস্থতার জন্য চিকিৎসার বিবরণ, হাসপাতালের নাম, চিকিৎসা ব্যয়ের বিবরণ ইত্যাদি তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ নিশ্চিত করতে হবে। অনুদান প্রদান প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা বিধায় সার-সংক্ষেপে সুনির্দিষ্ট অংকের সাহায্যের প্রস্তাব পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সার-সংক্ষেপে ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিহারের লক্ষ্যে সেটি যথাযথভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে কিনা, সে সম্পর্কে সার-সংক্ষেপ স্বাক্ষরের পূর্বে সচিববৃন্দ ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত হবেন।

মন্ত্রিসভার জন্য সার-সংক্ষেপ প্রণয়নের বিষয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ ইন-হাউজ প্রশিক্ষণ আয়োজনে আগ্রহী হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ   থেকে ‘রিসোর্স’ (প্রশিক্ষক) পাঠানো হবে।

সার-সংক্ষেপ প্রণয়নে ব্যবহৃত কাগজের আকার নথিতে রাখা অন্যান্য কাগজের আকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করার লক্ষ্যে সার-সংক্ষেপে এ-৬ আকারের পরিবর্তে এ-৪ আকারের কাগজ ব্যবহার এবং বাংলাদেশ ফরমস ও প্রকাশনা অধিদপ্তর সরবরাহকৃত নোটশিট, সার-সংক্ষেপে ব্যবহৃত কাগজ এবং স্টেশনারি সামগ্রীর মান উন্নয়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ নিজেদের এবং আওতাধীন সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য ‘কি পারফর্মেন্স ইন্ডেকেটর’ ( কেপিআই) নির্ধারণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ইনোভেশন ইউনিট থেকে কর্মকর্তাদের ‘ কেপিআই’ পরিমাপ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবগণের সঙ্গে আলোচনাক্রমে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ৬টি মিশনে নবসৃষ্ট শ্রম উইংয়ে কর্মকর্তাদের যোগদানের ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতাধীন সংস্থা ও প্রকল্পভুক্ত বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণের         ক্ষেত্রে সংস্থা ও প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-টেন্ডারিং পদ্ধতি ব্যবহারের সঙ্গে সংযুক্ত মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ তাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য বাস্তবায়নে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) সহায়তায় ই-টেন্ডারিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও উপস্থাপনার আয়োজন করবে। পরবর্তী একটি সচিব সভায় সিপিটিইউ সহায়তায় ই-টেন্ডারিং এর গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ সম্পর্কে উপস্থাপনের আয়োজন করা হবে।

আইন প্রণয়ন কার্যক্রম সুপরিকল্পিত, সুসমন্বিত ও ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা ক্রমে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা সম্বলিত লেজিসলেটিভ ক্যালেন্ডার প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

কোনো আইন প্রণয়নের পূর্বে আইনটির আর্থ-সামাজিক প্রভাব কী হতে পারে, তা নিরূপণের জন্য ‘ লেজিসলেটিভ ইমপ্যাক্ট এনালাইসিস’ করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ উদ্যোগ গ্রহণ করবে। লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এ কাজে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।

একে/এসএইচ