বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে সড়কপথে প্রতি টন ভারতীয় পণ্য পরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি ১ টাকা ২ পয়সা চার্জ প্রস্তাব করেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়।

ট্রানজিট বিষয়ক কোর কমিটি প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ভারতের কাছ থেকে কিলোমিটারে ৪ টাকা ২৫ পয়সা চার্জ আদায়ের প্রস্তাব করেছিল।

কোর কমিটির চেয়ে খোদ সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ অবিশ্বাস্য কম চার্জ নির্ধারনের প্রস্তাবে আপত্তি তুলে পুনরায় প্রস্তাব দিতে বলেছে ট্রানজিট ফি নির্ধারণ-সংক্রান্ত যৌথ কারিগরি কমিটি (জেটিসি)।

গত জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে সই হয় সংশোধিত প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি)। এর আওতায় শিগগিরই দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পণ্য পরিবহন শুরু হওয়ার কথা।

এ পণ্য পরিবহনে ফি নির্ধারণে গত ১৬ সেপ্টেম্বর বৈঠকে বসে জেটিসি। বৈঠকে ট্রানজিট ফি নির্ধারণ-সংক্রান্ত প্রস্তাব তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ভারতের প্রতি টন পণ্য পরিবহনের জন্য কিলোমিটারে ১ দশমিক শূন্য ২৪ টাকা মাশুল আরোপের প্রস্তাব করেন। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ চার্জ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

তবে এ প্রস্তাবে আপত্তি জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। বৈঠকে তিনি জানান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের (বিবিআইএন) মধ্যে সড়কপথে যান চলাচল শিগগিরই শুরু হবে।

সেজন্য নির্ধারিত টোল ও পরিবেশদূষণ চার্জের সঙ্গে পিআইডব্লিউটিটির চার্জ সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা না হলে ভিন্ন ভিন্ন চার্জ বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হবে।

যোগাযোগ করা হলে জেটিসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে আশুগঞ্জ বন্দর থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে। এতে ১ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা ঋণ দেবে ভারত।

এ ঋণের সুদ বাবদ বছরে প্রায় ২৭ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় এ সুদ বাবদ কোনো চার্জ ধরেনি।

ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের চার্জ আরোপ করা হবে, তা নির্ধারণে ২০১১ সালে গঠন করা হয় কোর কমিটি। ২০১২ সালে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তারা। ট্রানজিট ফি নির্ধারণে আট ধরনের চার্জ বিবেচনায় নেয়ার কথা বলা হয় প্রতিবেদনে।

এগুলো হলো— ব্যবহারকারী চার্জ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কনজেশন (সড়কে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ), বায়ু ও শব্দদূষণ, প্রশাসনিক, নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক চার্জ। ব্যবহারকারী চার্জের মধ্যে আবার অবকাঠামো উন্নয়নে জমি অধিগ্রহণ ও সড়ক ব্যবহারের ফলে ক্ষয়ক্ষতির চার্জ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি ৪ দশমিক ২৫২৮ টাকা চার্জ আদায়ের প্রস্তাব করা হয়। এর বাইরে কাস্টমস সার্ভিস চার্জ যানবাহন প্রতি ৫ হাজার ২২০ ও বিদেশী যানবাহন প্রবেশ ফি ২ হাজার ৩২৩ টাকা আদায়ের প্রস্তাব করে কোর কমিটি।

এ প্রসঙ্গে জেটিসির বৈঠকে উপস্থিত সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, কোর কমিটির সুপারিশ ছিল শুধু ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার জন্য।

তবে এখন বাংলাদেশও পিআইডব্লিউটিটির আওতায় ভারত হয়ে নেপাল বা ভুটানে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। তাই ভারতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও সমপরিমাণ চার্জ দিতে হবে। এ বিবেচনা থেকেই ন্যূনতম চার্জ আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বলেন, জেটিসির সুপারিশের ভিত্তিতে পিআইডব্লিউটিটি ও বিবিআইএনে সমপরিমাণ চার্জ আরোপ করা হবে। তবে বিবিআইএনের ট্রানজিট ফি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এটা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। বিবিআইএনের ট্রানজিট ফি চূড়ান্ত হয়ে গেলে তা জেটিসির কাছে পাঠানো হবে।

জানা গেছে, ট্রানজিট ফি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তার প্রস্তাব কাটছাঁট করেছে। আগেরবার ৫৮০ টাকা প্রস্তাব করা হলেও বর্তমানে তা ১৩০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। স্ক্যানিংয়ের জন্য ৩০০ টাকা, মার্চেন্ট ওভারটাইম ৪০, অটোমেশন সেবা বাবদ ১০ ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা বাবদ ৫০ টাকা বাদ দেয়া হয়েছে।

নতুন প্রস্তাবে নথি প্রক্রিয়াকরণে ১০, ট্রান্সশিপমেন্ট বাবদ ২০ ও নিরাপত্তা বাবদ ১০০ টাকাসহ মোট ১৩০ টাকা টনপ্রতি চার্জ আরোপের কথা বলা হয়েছে।

আর প্রহরা (অ্যাসকর্ট) দিয়ে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হলে এর সঙ্গে আরো ৫০ টাকা যোগ করার কথা বলেছে এনবিআর।

সূত্রমতে, ট্রানজিট ফি নির্ধারণী সভায় মার্চেন্ট ওভারটাইম চার্জ আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। বর্তমানে শুধু চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে মার্চেন্ট ওভারটাইম চালু রয়েছে।

ফলে ট্রানজিট পণ্য পরিবহন বাড়লে ভবিষ্যতে দুই দেশ মিলে মার্চেন্ট ওভারটাইমের চার্জ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

ট্রানজিট ফি নির্ধারণী সভায় জানানো হয়, এনবিআর ট্রানজিট পণ্যের ব্যাংক গ্যারান্টি নিতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জাহাজে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতি যাত্রায় ২ লাখ টাকার জামানত গ্রহণ করে।

একই পণ্যে দুই গ্যারান্টির জটিলতা এড়াতেই এনবিআরের ব্যাংক গ্যারান্টি নেয়ার দরকার নেই বলে সিদ্ধান্ত হয়।

এদিকে বিআইডব্লিউটিএ নৌ-প্রটোকলের আওতায় নতুন করে টনপ্রতি ১০ টাকা কার্যবেক্ষণ চার্জ আরোপের প্রস্তাব করেছে। এর বাইরে সংস্থাটি প্রতি যাত্রায় নৌযান প্রবেশ ফি ২ হাজার ৫০০ টাকা, প্রতি বিটে পাইলটেজ চার্জ ৩০০, জাহাজের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সংরক্ষণ (কনজারভেন্সি) বাবদ প্রতি বছর ৭৩, আশুগঞ্জে বার্থিং বাবদ ২৫০, শ্রমিক হ্যান্ডলিংয়ে টনপ্রতি ৪০ ও ল্যান্ডিং শিপিং চার্জ বাবদ ৩০ টাকা নিয়ে থাকে।

সেই সঙ্গে মংলা-ঘষিয়াখালী রুটটি ব্যবহারের জন্য টনপ্রতি গড়ে ৬ টাকা ও গাবখান রুটটির জন্য ৪ টাকা ক্যানেল চার্জ আদায় করা হয়। আর অপারেটরদের লাইসেন্স ফি বাবদ বছরে ২০ হাজার টাকা নিয়ে থাকে বিআইডব্লিউটিএ। সেগুলো বহাল থাকবে।

তবে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর নৌযানগুলোর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য টনপ্রতি ২ ডলার মাশুল নির্ধারণের প্রস্তাব বাতিল করা হয়।

উল্লেখ্য, বিআইডব্লিউটিএ ভারতের কাছে নৌ-রুট রক্ষণাবেক্ষণে বার্ষিক যে চার্জ পেয়ে থাকে, তা দ্বিগুণের প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে প্রতি বছর ১০ কোটি টাকা রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ পায় বাংলাদেশ।

সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার নৌ-রুটগুলো খনন, নাব্যতা রক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। সূত্র: বণিক বার্তা

ইআর