নড়াইল সদর উপজেলার বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল আগ্রাহাটি গ্রাম। ১৯৩২ সালে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় আগ্রাহাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৮৪ বছরের এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে শিক্ষার্থী-সংকটে ভুগছে। ২০০৮ সালের পর থেকে বিদ্যালয়টির তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীতে কোনো শিক্ষার্থী পড়ছে না।
ফলে দীর্ঘ আট বছর ধরে এ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। আমাদের জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়ের জানায়, জেলা প্রাথমিক অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জেলায় মোট ৫১৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৪ হাজার ৪২৬ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে।
তবে ব্যতিক্রম কেবল আগ্রাহাটি ও নন্দকোল প্রাথমিক বিদ্যালয় দুটি। এ বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এ দুই স্কুলের কোনো শিক্ষার্থীই অংশ নিচ্ছে না। জানা যায়, বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। আর শিশু শ্রেণীসহ কাগজ-কলমে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩ জন। গতকাল সরেজমিন বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, শিশু শ্রেণীতে তিনজন শিক্ষার্থী রয়েছে।
একটি শ্রেণীকক্ষের মধ্যেই বসে আছে প্রথম শ্রেণীর চারজন ও দ্বিতীয় শ্রেণীর দুজন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে সর্বসাকল্যে শিক্ষার্থী উপস্থিত আছে মাত্র নয়জন। চারজন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত আছেন দুজন। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক ছুটিতে আছেন। আর বাকি একজন শিক্ষক সাসপেনশনে আছেন প্রায় এক বছর ধরে। বিদ্যালয়টির এ দুরবস্থার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, একসময় বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী টাবরা ও নন্দকোল গ্রামে প্রায় ৫০০ হিন্দু পরিবার বসবাস করত।
এ গ্রামগুলোর সঙ্গে লাগোয়া লোহাগড়া উপজেলার দাঙ্গাপ্রবণ কুমড়ী গ্রাম। কুমড়ী বিলের মাঝখানে অবস্থানের কারণে ওই গ্রাম দুটির হিন্দুরা বিভিন্ন রকম অত্যাচারের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে শুরু করে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ সাল নাগাদ গ্রামগুলোর সব হিন্দু এলাকা ছাড়া হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমতে থাকে।
পরবর্তী সময়ে কুমড়ী থেকে আসা মানুষজন এখানে বসতি শুরু করলে গত ২৬ বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। কুমড়ী গ্রামের পশ্চিমপাড়া থেকে ২৬ বছর আগে আগ্রাহাটি গ্রামে আসেন মিন্টু খাঁ। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন এখানে আসি, তখনো এ গ্রামে প্রায় সাড়ে ৩০০ ঘর নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল। সে সময় এ স্কুলে প্রায় আড়াইশ ছাত্রছাত্রী ছিল। কিন্তু তারা ভারতে চলে যাওয়ার পর জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যায়।’
এছাড়া বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান জানান, বর্ষাকালে এখানকার রাস্তাঘাটের বেহাল দশা হয়। এ কারণেও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করতে চান না। স্কুলের সহকারী শিক্ষক শরীফ মোজাফফর হোসেন জানান, অনেক দিন ধরেই বিদ্যালয়টি এ বেহাল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে এ স্কুলে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল বাশার মিনার জানান, ২০১০ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ জন। পরে আরো কয়েকজন ভর্তি হলেও তারা অন্য বিদ্যালয়ে চলে যায়।
এ বিষয়ে কথা হলে নড়াইল সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, কয়েক বছর ধরেই আগ্রাহাটি ও নন্দকোল গ্রামের প্রাইমারি বিদ্যালয় দুটির এ অবস্থা চলছে। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিশুদের টিফিনের ব্যবস্থা ও উপবৃত্তি দেয়া গেলে এ সংকট কেটে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়
উজ্জ্বল/জেড





