আজ ভয়াল সেই ১৫ নভেম্বর সিডর দিবস। আট বছর আগে ২০০৭ সালের এই দিনে ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়।
এদিন মারা যায় হাজার হাজার মানুষ ও অসংখ্য গবাদিপশু, ভেসে গেছে বেড়িবাঁধ, কোটি কোটি টাকার ফসল, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। উপকূলের বেঁচে থাকা মানুষগুলো কিছুতেই ভুলতে পারছে না সিডরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি। তাদের এখনও সেই দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায়। সেদিন সিডরের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলের কয়েকটি জেলা-
বরগুনা : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালের এই ঘূর্ণিঝড়ে সিডরে জেলায় মারা যায় ১ হাজার ৩৪৫ মানুষ। নিখোঁজ হন ১৫৬ জন। ৩০ হাজার ৪৯৯টি গবাদি পশু ও ৬ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯টি হাঁস-মুরগি মারা যায়। ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬১টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সম্পূর্ণ গৃহহীন হয়ে পড়ে ৭৭ হাজার ৭৫৪টি পরিবার। ভয়াল সিডরের স্মৃতিতে এখনও শিউরে ওঠেন উপকূলের মানুষ। মহাবিপদ সংকেতের কথা শুনলে আতংকি হয়ে ওঠেন। বরগুনা সদর উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা নলটোনা গ্রাম। ঘূর্ণিঝড়ের পরের দিনই সেখানে অর্ধশতাধিক মানুষের লাশ পাওয়া যায়। গ্রামটি পানির নিচে থাকায় লাশ দাফনের জন্যও কোনো স্থান খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঝালকাঠি : বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লক্ষাধিক পরিবার। কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বাঁধ, ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ বিভিন্ন সেক্টরে প্রায় ছয়শ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালানোসহ দুর্গতদের পুনর্বাসনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বিভিন্ন স্থানে ভেঙে পড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ-কালভার্ট সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। ওই সময়ে সড়ক বিভাগের আওতাধীন ১৮টি সড়ক এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের আওতাধীন ৩৯টি সড়ক ও ২০টি ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থ বরাদ্দ ও উদ্যোগের অভাবে অনেক কাজ ঝুলে রয়েছে। ভেঙে পড়া সেতুতে কাঠের পাতাটন, বাঁশের সাঁকো তৈরি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। বর্তমান সরকার আমলে অনেক সাইক্লোন সেল্টার নির্মিত হয়েছে। যা ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও উন্নয়ন হয়েছে।
কলাপাড়া : সিডরের ভয়াল তাণ্ডবে কলাপাড়ায় ৯৪ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আজও নিখোঁজ রয়েছে সাত জেলে ও এক শিশু। আহত হয়েছে ১৬৭৮ জন। এর মধ্যে ৯৬ জন প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে। বিধবা হয়েছেন ১২ গৃহবধূ। এতিম হয়েছে ২০ শিশু। সম্পূর্ণভাবে ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে ১২ হাজার ৯০০ পরিবার। আংশিক বিধ্বস্ত হয় ১৪ হাজার ৯২৫টি ঘরবাড়ি। তিন হাজার ২২৫ জেলে পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকৃতির ওই কালো থাবায় শতকরা ৯০ ভাগ পরিবার ক্ষতির শিকার হয়। এর মধ্যে ৫৪৭৩টি পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। ৫৪০ পরিবারকে ব্যারাক হাউস নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে পাঁচ বছর আগে। কিন্তু এসব ব্যারাকের অন্তত ৩০০ কক্ষে লোকজন থাকছে না।
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) : ভয়ংকর সিডরের সেই কাল রাতের কথা স্মরণ করতেই তারা যেন আবার ও শোকে উথলে ওঠেন স্বজন হারানোর বেদনায়। ভুলে যেতে চাইলে ও মনের গহীনে বাসা বেঁধে আছে জমাট বাঁধা যন্ত্রণা। এ দিনটি এলেই নতুন করে তাদের স্মরণে আসে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, শিশুসন্তান বা নিকট আত্মীয়স্বজনের কথা। বিশেষ করে যারা হারিয়েছেন বানের পানিতে অথবা গাছের নিচে চাপা পড়ে তাদের স্বজনদের অশ্রু সংবরণের নয়। ১৫ নভেম্বর ২০০৭ সালের সেই কালো রাতের পর এখনও কেউ বিধ্বস্ত। ভিটেমাটিতে আবার কেউবা গণকবরের পাশে কেঁদে বেড়াচ্ছেন স্বজনদের কথা মনে করে।
মোরেলগঞ্জ : সডরের অগ্নিমূর্তির কথা মনে করে অনেকে এখনও আঁতকে উঠে নিজের অজান্তে। মহাপ্রলয়ংকারী সিডরে উপকূলীয় বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ এলাকার সবুজের সমারোহকে ধ্বংস যজ্ঞে পরিণত করে ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়েছে বৃক্ষরাজি ও উঠতি ফসলের। ২১শ ৬৫ হেক্টর জমির উফশী ফসল এবং ১২ হাজার ৭৮৮ হেক্টর জমির আমন ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়।
এমএইচ





