অবরোধ-হরতাল যেন রাতের নাশকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। টানা ৭৭ দিন অবরোধে মহাসড়কে যানবাহনে পেট্রলবোমা ছোড়ার ঘটনাই বেশি আলোচিত। নানা উদ্যোগ নিয়েও এই নাশকতা বন্ধ করতে পারেনি প্রশাসন। প্রতিদিনই ঘটে চলেছে অগ্নিসংযোগের ঘটনা, মরছে মানুষ। বার্ন ইউনিটে বাড়ছে আর্তনাদ। সর্বশেষ শনিবার রাতে মাগুরায় ট্রাকে ছোড়া পেট্রোলবোমায় প্রাণ গেল তিনজনের। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আরও ছয়জন। রোববার ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে মারা গেছেন আরও একজন, যিনি গত বুধবার রাতে চাঁদপুরে দগ্ধ হয়েছেন।
পুলিশ, হাসপাতাল, পরিবহন ব্যবসায়ী, ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭৭ দিনের অবরোধ-হরতালের মহাহসড়কে অন্তত ২১০০ যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। এ সময় নাশকতায় মারা গেছেন ১২৮ জন। তাদের মধ্যে ৭৪ জনই যানবাহনে লাগানো আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পুড়েছেন আরও সাড়ে তিনশ মানুষ।
রাতের আঁধারে যানবাহনে আগুন লাগানোর এসব ঘটনা ঘটছে অঞ্চলিক মহাসড়কে। কয়েকটি জেলা ও নির্দিষ্ট এলাকায় বেশি বোমা হামলা চালাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। তবে পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন বলছে, মহাসড়কে নিরাপত্তা দিতে যথেষ্ট সচেষ্ট তারা।
ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেশি পেট্রোলবোমা হামলা হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থল পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষীপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ফেনী, বগুড়া, সাতক্ষীরা, গাইবান্ধা, কিশোরগঞ্জ ও মাগুরা এলাকায় সবচেয়ে বেশি নাশকতার ঘটেছে। প্রথম দিকে রাজধানী, রাজশাহী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুমিল্লা, সিলেট ও দিনাজপুর এলাকায় বেশি যানবাহনে আগুন দেয়া হয়। তবে এখন ফেনী, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সড়কে যানবাহনে বেশি হামলা করছে দুর্বৃত্তরা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে গত ১৩ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুরে বাসে আগুনের ঘটনায় শিশুসহ ছয়জন নিহত হন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসের আগুনে মারা গেছেন আটজন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সাহাপাড়া ইউনিয়নের তুলসীঘাটে বাসে পেট্রোলবোমায় শিশু নারীসহ মৃত্যু হয় আটজনের। একই দিন ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদীতে ট্রাকে আগুনে প্রাণ হারার আরো তিনজন।
জানা যায়, গত ৫ মার্চ এক রাতেই কিশোরগঞ্জ, চাপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম হাটহাজারীসহ বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে পেট্রোলবোমা হামলায় ২২ জন দগ্ধ ও তিনজন নিহত হন। এরমধ্যে কিশোরগঞ্জের ভৈরব-কিশোরগঞ্জ সড়কের সুলতানপুরে সিলেটগামী শাহজালাল পরিবহনের একটি বাসে পেট্রোলবোমা হামলায় দগ্ধ হন ১৫ জন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩ জন, মানিকগঞ্জ ও নওগাঁয় ট্রাকে দুইজন এবং হাটহাজারীতে ২ জন দগ্ধ হন। চাপাইনবাবগঞ্জে আগুনে পুড়ে এক জন এবং চট্টগ্রামে দুজন মারা যান। গত ১০ মার্চ রাতে নোয়াখালীর মাইজদী এলাকায় ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলায় পুড়েছেন তিনজন। গত বুধবার রাতে চাঁদপুরের চান্দ্রা এলাকায় ট্রাকে দুর্বৃত্তদের পেট্রোলবোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ট্রাকের চালক জাহাঙ্গীর আলম ও মালিক খন্দকার শরীফ উদ্দিন। দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আরো দুই শ্রমজীবী। একই রাতে চাঁদপুরের আরেকটি যানবাহনে পেট্রোলবোমা হামলায় পুড়েছের পাঁচজন। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে মাগুরায় ট্রাকে পেট্রোলবোমা হামলায় মারা গেছেন তিন শ্রমজীবী। দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আরো ছয়জন।
অন্যদিকে, গত এক মাসে ফেনীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে ব্যাপক নাশকতা ঘটেছে। গত ১ মার্চ ফেনীর দাগনভুঁঞয়ার মুক্তার বাড়ি এলাকায় সুগন্ধা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় চার হাজার কবুতর পুড়ে মারা যায়। ৩ মার্চ ফেনীর দেবীপুর এলাকায় একটি বাস ও ট্রাকে দুর্বৃত্তরা আগুন দিলে তিনজন দগ্ধ হন। গত শুক্রবার গভীর রাতে ফেনীর দাগনভূঞয়া এলাকায় ট্রাকের আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ইউসুফ আলী খান নামে এক মুক্তিযোদ্ধা। এতে ট্রাকটির চালক ইউসুফ ছাড়াও চারজন দগ্ধ হন। এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে দাগনভূঞার আমিরগাও এলাকায় বাসের আগুনে পুড়েছেন ৯ যাত্রী। ৪ মার্চ ভোরে কোরাইশ বারো বাজারে যাত্রী নামিয়ে বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনীর পুলিশ সুপার সাইফুল হক জানান, একের পর এক নাশকতার ঘটনায় মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
একটি সূত্র জানিয়েছে, টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে দেশের প্রায় ২১ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। সড়কে নিরাপত্তা দিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। গত ৬ জানুয়ারি থেকে আবার অবরোধ শুরু হলে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা মহাসড়কে রাতে নিরাপত্তা জোরদার করে। পুলিশ প্রহরায় যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এরমধ্যেই একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। তাই গত ৭ ফেব্রুয়ারি পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহিদুল হক রাত ৯টার পর বাস না চালানোর অনুরোধ জানান। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ীরাও ওই অনুরোধে সম্মত হন।নিরাপত্তা জোরদারে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে নজরদারি বাড়াতে আনসার সদস্যও চেয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। এখন ৯৯৩টি পয়েন্টে ১১ হাজার ৯১৬জন আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মহাসড়কে টহল দিচ্ছে বিজিবি ও র্যাবের দলও।
এদিকে, নাশকতার ঘটনা কিছুটা কমে আসলে গত সপ্তাহ থেকে আবার রাতে বাস চলাচল শুরু হয়। একের পর এক নাশকতার কারণে জীবন শঙ্কা নিয়েই গন্তব্যে যাত্রা করছেন সাধারণ মানুষ।
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মল্লিক ফকরুল ইসলাম বলেন, ‘মহাসড়কে নিরাপত্তা দিতে আমরা সতর্ক অবস্থানেই আছি। এখনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। তাই রাতে আনসার সদস্যদের নিয়ে আমরা পাহারা জোরদার করেছি। হামলাকারীদের ধরতে যৌথ অভিযানও চলছে।’
জেআই





