আজ ৬ ডিসেম্বর। যশোর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিন পাকিস্তানের নবম ডিভিশনের সঙ্গে ভারতীয় নবম পদাতিক ও চতুর্থ মাউন্টেন ডিভিশনের লড়াই হয়। বিকালেই পাক সেনা অফিসাররা বুঝে যান, যশোর দুর্গ আর কোনভাবেই রক্ষা করা সম্ভব নয়।

বেনাপোল অঞ্চলে দায়িত্বরত লে. কর্নেল শামসকে নওয়াপাড়ার দিকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত। আর নিজের ব্রিগেড নিয়ে রাতের আঁধারে খুব গোপনে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে যান খুলনার দিকে।

৬ ডিসেম্বর এভাবেই একাত্তরে প্রথম শত্রু মুক্ত জেলা হওয়ার গৌরব অর্জন করে যশোর।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছিল পাকবাহিনীর দ্বিতীয় শক্তিশালী দুর্গ। অবস্থানগত কারণে এটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মূলত জগন্নাথপুরের ভয়াবহ যুদ্ধের পরই পাক বাহিনীর চৌগাছা ঘাঁটির পতন হয়। ভেঙে যায় তাদের মনোবল। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের চরম আঘাতে পাকসেনারা যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পালিয়ে যায় খুলনা ও মাগুরার দিকে।

যশোর হানাদারমুক্ত হওয়ার পর থেকেই দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল মুক্ত হতে থাকে।

জগন্নাথপুরের সেই যুদ্ধ শুরু ২০ নভেম্বর ১৯৭১। সেই দিন ছিল ঈদের দিন। সকালে যশোরের চৌগাছার জগন্নাথপুরের মানুষগুলো যখন তৈরি হচ্ছে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ উৎসব ঈদ উদযাপন করতে তখনই হানাদার পাকবাহিনীর ২০/২৫টি গাড়ি ঢোকে জগন্নাথপুর (বর্তমানে মুক্তিনগর) গ্রামে।

ঈদের দিন নামাজ পড়তে যাওয়া মুসল্লিরা মিষ্টিমুখ করার আগেই বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পাখির মত লুটিয়ে পড়েন। বর্বর পাঞ্জাবি সেনারা বাঙালি দেখামাত্রই গুলি চালাতে থাকে। একদিনেই তারা হত্যা করে ৩০ জনকে; যাদের সবাই নিরীহ, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ।

সংসদ সদস্য মসিয়ুর রহমানের ভাই আতিয়ার রহমানসহ আরও দু জনকে ধরে এনে পুড়িয়ে মারে ওই দানবরা। বাড়ির পর বাড়ি আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। অসহায় মানুষ তাদের প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিক পারে, পালায়। এরপরেও কিছু মানুষ বাপ-দাদার ভিটে আঁকড়ে পড়ে ছিল।

সন্ধ্যায় ছদ্মবেশধারী ৪ মুক্তিযোদ্ধা এসে তাদেরও অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। বললেন, রাতে বড় ধরণের যুদ্ধ হবে।

জনমানবশূন্য নীরব নিস্তব্ধ জগন্নাথপুর গ্রাম সহসাই প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোলাগুলির শব্দে। শুরু হয় ভয়ংকর যুদ্ধ। আশপাশের কয়েকটি গ্রামও পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।

মুক্তি আর মিত্রবাহিনী অবস্থান নেয় জগন্নাথপুর গ্রামের চাড়ালের বাগানে। ট্যাংকবহর নিয়ে পাকবাহিনী গ্রামে ঢোকামাত্রই তাদের সাতটি ট্যাংক ধ্বংস করে দেয় মিত্রবাহিনী। এক পর্যায়ে পশ্চিমপাড়ার তেঁতুলতলায় অবস্থান নেয় মিত্রবাহিনী।

সেখান থেকেই তারা গোলা ছুড়ছিল। সেসময় পাকবাহিনী ছিল বাঁশবাগানে। প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দের সাথে হাজারো সৈন্যের গগণবিদারি চিৎকার, আর চেচামেচি।

দীর্ঘসময় ধরে যুদ্ধ চলায় গুলি তখন শেষের দিকে। দু পক্ষই চলে আসে কাছাকাছি, একশ গজের মধ্যে। জগন্নাথপুর স্কুল মাঠে শুরু হয় হাতাহাতি, মল্লযুদ্ধ। বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে এই তান্ডব।

২২ নভেম্বর আবারও বিমান হামলা চালায় পাকবাহিনী। মিত্রবাহিনীও পাল্টা বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করে। ধ্বংস করে আরও সাতটি ট্যাংক ও বহু সাঁজোয়া গাড়ি। পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকবাহিনী। মিত্রবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গাড়ে জগন্নাথপুরে।

এই যুদ্ধে দু পক্ষের সহস্রাধিক সৈনিক মারা যায়। এরপর মুক্তিবাহিনী মিত্রবাহিনীকে সাথে নিয়ে হামলার পর হামলা চালাতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধে যশোর ছিল ৮ নম্বর সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুর। তাঁর অধীনে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবু ওসমান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন নাজমূল হুদা। এই ফ্রন্টেই ৫ সেপ্টেম্বর প্রাণ উৎসর্গ করেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ।

জগন্নাথপুরের এই যুদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কারণ এই যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পরই পাকিস্তানীদের মনোবল চুরমার হয়ে যায়।

৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পতন ঘটে যশোর ক্যান্টনমেন্টের। দেশের প্রথম জেলা শহর হিসেবে শত্রু সেনামুক্ত হয় যশোর। আর এদিনই ভারত স্বীকৃতি জানায় স্বাধীন বাংলাদেশকে।

এসএইচ