স্যান্ডউইচ, রোল, বার্গার, প্যাটিস, পিজ্জা- ফাস্টফুড খাবারের রমরমা এই বর্তমান সময়েও নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে আঠারো শতকের ঐতিহ্যবাহী খাবার বাকরখানি। পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো অনেকের সকাল-বিকেলের নাস্তায় প্রথম পছন্দ বাকরখানি থাকেই। ঐতিহ্যবাহী খাবারটি এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে মজাদার এই বাকরখানি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাকরখানি প্রস্তুতপ্রণালিতে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন উপাদান। সাধারণত ময়দা, সোডা, ডালডা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বাকরখানি তৈরি করা হয়। কিন্তু বর্তমানে বাকরখানি তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে ছানা, পনির, চিনি, নোনতা, কাবাব, কিমা ও নারিকেলের সংমিশ্রণ। এ ছাড়া গরু ও খাসির মাংসের ঝুরা দিয়েও এক ধরনের বাকরখানি তৈরি করা যায়, যা অত্যন্ত সুস্বাদু। মাংসের ঝুরার বাকরখানি সাধারণত ঈদের সময় অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হয়। আবার ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে নোনতা বাকরখানি।

বাকরখানি নামে প্রসিদ্ধ খাবারটির অপর নাম শুখারুটি (শুকনো)। ময়দা ও তেল দিয়ে তৈরি মজাদার এই বাকরখানি এখনো পুরান ঢাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয়। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে উৎপত্তি এই খাবারের। একসময় পুরান ঢাকার মানুষ উপঢৌকন হিসেবে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতেও পাঠাত এই বাকরখানি। তবে এখন সেই সংস্কৃতি কালচার আর আগের মতো নেই। সকালের নাস্তা হিসেবে খাবারের টেবিলে এখনো পুরান ঢাকার অধিকাংশ মানুষের প্রথম পছন্দ বাকরখানি। শুধু ঢাকার আদিবাসীরাই নয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছেও বাকরখানির জনপ্রিয়তা রয়েছে।

বাকরখানির ইতিহাস: ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাকরখানি রুটির নামের পেছনে রয়েছে আগা বাকের ও খনি বেগমের প্রেমের ইতিহাস। মির্জা আগা বাকের ঢাকায় বাকরখানি রুটির প্রচলন করেন। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর দত্তক ছেলে আগা বাকের প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। যুদ্ধবিদ্যায়ও ছিলেন পারদর্শী ও প্রসিদ্ধ। বাকেরের প্রেয়সী ছিলেন রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকি খনি বেগম। খনি বেগমের মৃত্যুর পর আগা বাকের দ্বিতীয় সুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যাকে বিয়ে করেন। কিন্তু আগা বাকের মন থেকে খনি বেগমের প্রেমের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তাই আগা বাকেরের আবিষ্কৃত রুটির নাম হয়ে যায় বাকরখানি। ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, লালবাগ কেল্লার কাছে প্রথম বাকরখানির দোকান গড়ে ওঠে। সেখান থেকে আস্তে আস্তে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বাকরখানির দোকান বিস্তার লাভ করে।

বাকরখানির ঐতিহ্যে মুগ্ধ হয়ে কবি প্রতুল মুখোপাধ্যায় তার কবিতার ভাষায় বলেছিলেন, ‘আলু বেচো, ছোলা বেচো, বেচো বাকরখানি/ বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি।/ ঝিঙে বেচো পাঁচ সিকেতে হাজার টাকায় সোনা/ হাতের কলম জনম দুঃখী তাকে বেচো না।’ এই চরণগুলোই প্রমাণ করে বাকরখানির ইতিহাস অনেক পুরনো।

ফাস্টফুডের যুগেও জনপ্রিয় বাকরখানি: পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাকরখানির দোকান ঘুরে দেখা যায়, ময়দা ও তেল দিয়ে খামির বানিয়ে তা মচমচে করে ভেজে বাকরখানি তৈরি করা হয়। কিন্তু আঠারো শতকের সেই আসল বাকরখানির স্বাদ বর্তমান বাকরখানির মধ্যে পাওয়া যায় না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আসল স্বাদ না পাওয়া গেলেও জনপ্রিয়তা এখনো কমেনি প্রসিদ্ধ এই বাকরখানির। এখনো সেখানে বিভিন্ন ধরনের বাকরখানি তৈরি করা হচ্ছে। সাধারণ বাকরখানির দাম প্রতিটি তিন টাকা এবং প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১১০ টাকা। তবে চিনি মেশানো বাকরখানির দাম একটু বেশি। প্রতিটি পাঁচ টাকা এবং প্রতি কেজি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ পুরান ঢাকায় বাকরখানি কিনতে আসে। বিশেষ করে ফাস্টফুডের দোকান মালিকরা আগে থেকেই অর্ডার দিয়ে রাখে। তারা এখান থেকে বাকরখানি কিনে তাদের নিজেদের দোকানে বিক্রি করে।
রায়সাহেব বাজারের হিরু নামের বাকরখানি ব্যবসায়ীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়। তিনি মানবকণ্ঠকে জানান, তিনি বংশপরম্পরায় প্রায় ৪৫ বছর ধরে বাকরখানি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, পুরান ঢাকায় হাজারো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে যারা বাকরখানির ব্যবসায় জীবিকা উপার্জন করে থাকে। পুরান ঢাকার বাসিন্দারা সাধারণত ভোজনবিলাসী ও খাদ্যরসিক। যে কারণে এই ফাস্টফুডের যুগেও সগৌরবে টিকে আছে মুঘল আমলের খাবারগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় ও প্রচলিত বাকরখানি।

‘ভেজালমুক্ত’ খাবার বাকরখানি: এই বাকরখানি ব্যবসায়ী বলেন, বাকরখানি বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। চা থেকে শুরু করে তরকারি, বিভিন্ন ধরনের মাংস, দুধ, মিষ্টি ইত্যাদির সঙ্গে। অনেক সময় ডায়াবেটিক রোগীসহ বিভিন্ন রোগীরাও বাকরখানি খেয়ে থাকেন। তিনি বলেন, বর্তমানে খাবারের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মেডিসিন মেশানো থাকে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু বাকরখানিতে কোনো ভেজাল নেই। আর ভেজাল থাকলেও আগুনে পুড়ে ভেজালমুক্ত হয়ে যায়।

পুরান ঢাকার ডালপট্টি মোড়ের আজগর আলী নামের এক বাসিন্দা মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘বাকরখানি একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। আমরা ছোটবেলা থেকে খেয়ে আসছি। এটা ঘরে রেখে অনেক দিন ধরে খাওয়া যায়। অনেক সময় সকালের নাস্তা বানাতে সমস্যা হয়, সে সময় বাকরখানি দিয়ে অতি সহজেই নাস্তা সেরে ফেলা যায়। আবার অনেক সময় ডাক্তার বিভিন্ন রোগের কারণে ভাত খেতে নিষেধ করে তখন গরম গরম দুধ বা চা দিয়ে রোগীরা অতি সহজেই বাকরখানি খেতে পারেন।’

রওশন আরা খাতুন বলেন, ‘শীত বা বৃষ্টির সময় চায়ের সঙ্গে বাকরখানি খেতে খুব ভালো লাগে। আবার বিকেলে বারান্দায় চেয়ারে বসে গল্প করতে করতে বাকরখানি আর চা আমাদের অতি প্রিয়।’ তিনি বলেন, ‘বাকরখানি পেতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। অতি সহজেই বিভিন্ন দোকানে বাকরখানি পাওয়া যায়। শর্টকাট খাবার হিসেবে বাকরখানি ভালোই লাগে।’