দেশের দলিত জনগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে সুবিধাবঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতা এক দিকে নিরাপত্তাহীন করে রেখেছে, অন্য দিকে তাদের উন্নয়নের পথও রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য হরিজনসহ অন্যান্য দলিত গোষ্ঠীর শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিতে হবে।

বুধবার রাজধানীর কাওরান বাজারস্থ দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়ে ‘দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠন হিকসের সহযোগিতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও এনএনএমসি যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান মোয়াজ্জেম হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন।

এনএনএমসির সমন্বয়ক (অ্যাডভোকেসি ও যোগাযোগ) মনজুন নাহারের সঞ্চালনায় বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুন নাহার, হেকসের ব্যবস্থাপক (বাজার উন্নয়ন) নুরুন নাহার, পরিত্রাণের কর্মসূচি পরিচালক উজ্জ্বল কুমার দাস, বিডিইআরএমর সহসভাপতি মনি রানী দাস, সারির নির্বাহী পরিচালক প্রিয় বালা বিশ্বাস, হরিজন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র দাস, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জেষ্ঠ্য ব্যবস্থাপক (কর্মসূচি) মহুয়া লিয়া আলিয়া, নাগরিক উদ্যোগের কর্মসূচি সমন্বয়ক আফসানা আমিন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘দলিত বা অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পরিচয় সংকটটি সমাজের অধিকাংশের মজ্জাগত। এভাবে চলতে পারে না। দলিত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের আগে তাদের পরিচয় ফিরিয়ে দিতে হবে। দলিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে কাজ করা সংগঠনগুলো চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এ জন্য একসঙ্গে কাজ করবে।’ তিনি বলেন, ‘দলিতদের মানবাধিকার ও ক্ষমতায়নে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিকতার পরিবর্তনের কথা বলা হয়। সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম আমরা কমিশনের মাধ্যমেও নিতে পারি।’ তিনি আরো বলেন, ‘অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ে যেতে হয়। এ ক্ষেত্রে সামাজিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হরিজন ও দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে সেই নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে।’

দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, ‘সকল নাগরিকের সমান মর্যাদা ও অধিকারের প্রতিশ্রুতি আমাদের সংবিধানে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায় না। দলিতসহ অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ভাগ্য বা অবস্থা পরিবর্তনের আগে সকলের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়িত করে ফেলেছি। রাজনীতি এখন রাজা হওয়ার নীতি হয়ে গেছে। আমাদের মনটাও গরিব হয়ে গেছে। সবার আগে জাতপাত বিবেচনা বর্জন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সমাজ থেকে বঞ্চনা-বৈষম্য দূর করার জন্য পারিবারিক শিক্ষা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের পরিবার থেকেই মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। পাঠ্যসূচিতে হরিজন, দলিতসহ অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনের গল্প-শিক্ষা বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে, এর মধ্যে নারীরা আরো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের ক্ষমতায়ন জরুরি।’

সভাপতির বক্তব্যে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। এটাই সবেচেয়ে বড় কাজ।’ তিনি বলেন, ‘দলিতদের বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের মাঠ পর্যায়ের মনোভাব একই রকম। বিভিন্ন স্থানে হরিজন-দলিতদের উচ্ছেদের চেষ্টায় জড়িতদের মধ্যে সব দলের লোকই থাকেন। তাদের উন্নয়নে ও ক্ষমতায়নে সামাজিক, রাজনৈতিক আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। রাষ্ট্রের সদ্বিচ্ছাই দলিতদের বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে পারে।’

জেআ