রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ‘ছেলেধরা’সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার শিকার তাসলিমা বেগম রেনুর ছোট্ট মেয়ে তাসমিন মাহিরা তুবার ঈদ করেছে মাকে ছাড়াই।
চার বছর বয়সী তুবা ঈদের দিন মায়ের জন্য খিচুড়ি রেঁধেছে। খেলনা পাতিলে রান্না করা ওই খিচুরি নিয়ে মায়ের অপেক্ষায় প্রহর গুণেছে।
ঈদের দিন সোমবার সন্ধ্যায় মহাখালীর ওয়ারলেস গেইট এলাকায় রেনুদের বাসায় ঢুকতেই দেখা মিলল তুবার, খেলনা চুলায় রান্নার হাঁড়ি চড়িয়ে ব্যতিব্যস্ত সে। কী রাঁধছ জানতে চাইলে লাকড়ি নাড়িয়ে জানান দিল, ‘খিচুড়ি’।
পাশ থেকে তার খালা নাজমুন নাহার নাজমা বললেন, “অনেকক্ষণ ধরেই মায়ের জন্য রান্নাবাড়া করছে। তুবার ধারণা, মা আমেরিকায় আছে; ওর হাতে রান্না করা খিচুড়ি খেতে চলে আসবে।
“ওর খেলনা ফোনটা কানে দিয়ে মায়ের সঙ্গে একা একাই কথা বলে। পরে আমাদের বলে, আম্মুর সঙ্গে কথা বলবে? আমাদের বুকটা ভারী হয়ে যায়। ছোট্ট মেয়ের সামনে কাঁদতে পারি না।” মাকে হারিয়ে ‘শান্তশিষ্ট’ তুবা এখন ‘অস্থির’ হয়ে উঠেছে বলে জানালেন রেনুর ভাগনে নাসির উদ্দিন টিটো।
তিনি বলেন, “আগে কিছু বায়না করলে বুঝিয়ে বললে শুনত। কিন্তু খুব অস্থির হয়ে গেছে। কোনো কিছু বলে বোঝানো যায় না। আমরাও ওদের নিয়েই ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করি। ওর মাকে খোঁজে; হয়তো পায় না। ও যেটা বলতে চাচ্ছে সেটা হয়তো বুঝাতে পারে না।”
তুবা এখনও মায়ের অপেক্ষায় থাকলে তার এগারো বছরের ভাই মাহির মায়ের জন্য কেঁদে বুক ভাসায়। গণপিটুনিতে মায়ের নির্মম মৃত্যু এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।
ভবিষ্যতে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবায় ব্রতী হওয়ার স্বপ্ন দেখে লক্ষ্মীপুরের লামচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহির।
বুকভরা শূন্যতা বুকে চেপে ঈদের নামাজ পড়ে মায়ের আত্মার শান্তির জন্য হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার আছে প্রার্থনা করেছে সে।
তাসলিমার ভাগনে বলেন, “বাসার প্রতিটা জায়গায় আন্টির স্মৃতি রয়েছে। কোরবানির ঈদের সময় তিনি রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকতেন।
ফকিরদের দেওয়ার জন্য আমাকে টাকা দিতেন। গরুর মাংস বাসায় নিয়ে এলে ফকিরদের জন্য ভাগ করে রাখতেন। অনেক গরিব মানুষ খুঁজে খুঁজে মাংস বিলি করতেন।”
“আমরা পিঠাপিঠি তিন বোন একই রঙের পোশাক কিনতাম।রেনু সবার ছোট ছিল বলে আমাদের আদরের ছিল। ঈদের দিন সন্ধ্যার পর একসঙ্গে ঘুরতে যেতাম। আজকে আমি একা হয়ে গেছি, বড় একা।
“ঈদের আগের দিন মেহেদি কিনে নিয়ে আসতাম। খুব সুন্দর মেহেদি লাগাতে পারত রেনু।আমাকে নকশা করে মেহেদী লাগিয়ে দিত।”
সবচেয়ে ছোট মেয়েকে অকালে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন সত্তরোর্ধ্ব সবুরা খাতুন। সকাল থেকেই তিনি মেয়ের জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন।
নাজমা বলেন, “রেনু মাকে গোসল করিয়ে দিত। সেমাই পায়েশ রান্না করে মাকে খাওয়াতো। আজকে মা দেখেন, ও নেই। মা অনেক ভেঙে পড়েছে।”
প্রসঙ্গত শনিবার সকালে বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন তাসলিমা বেগম। তার দুই সন্তানের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে স্কুলের গেটে কয়েকজন নারী তাসলিমার নাম-পরিচয় জানতে চান। পরে লোকজন তাসলিমাকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে কয়েকশ লোক একত্র হয়ে তাসলিমাকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যায়। স্কুলের ফাঁকা জায়গায় এলোপাতাড়ি মারপিট করে গুরুতর জখম করে। পরে উদ্ধার করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন তিনি মারা যান।
এএস





