ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতি নিয়ে ১১টি খাত চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একইসঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশও তুলে ধরেছে দুদক।  

বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) সচিবালয়ে প্রতিবেদনটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের কাছে তুলে দেন দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান।

দুদক কমিশনার বলেন, ওয়াসার সরবরাহ করা পানি এখনো পানযোগ্য নয়। এর বিভিন্ন প্রকল্পে কালক্ষেপণের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গেছে। কাজের চেয়ে বেশি টাকা দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারদের। এতে কাজ তুলে নেওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, কাজের মান ও পরিসর বিবেচনা করে ওয়াসা যদি টাকা ছাড় করত তাহলে ভালো ফল পাওয়া যেত। বলা যায়, স্পষ্টতই এখানে ওয়াসার সংশ্লিষ্টতা আছে।

সরকারি ২৫ টি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইন, বিধি, পরিচালনা পদ্ধতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ-অপচয়ের দিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দল গঠন করে দুদক। দলগুলোকে এসব প্রতিষ্ঠানের জনসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সফলতা ও সীমাবদ্ধতা, আইনি জটিলতা, সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি ও দুর্নীতির কারণ চিহ্নিত করে তা বন্ধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিশনের নির্দেশনার আলোকে দুদকের দলগুলো প্রতিবেদন দাখিল করছে। ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিমান, রাজউক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষসহ ১৩ টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়াসা নিয়ে এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলো।

দুদকের প্রতিবেদনে ওয়াসায় দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পকাজে দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে ৮টি। এগুলোর মধ্যে প্রধান হলো- ওয়াসার প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ঢাকাসহ বৃহত্তর মিরপুর এলাকার পানির চাহিদা পূরণে মিরপুরের ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করে প্রকল্পের কথা তুলে ধরা হয়। প্রকল্পটি ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর অনুমোদন হয়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী সরকারের ১৪২ কোটি, ওয়াসার ১০ কোটি, প্রকল্প সাহায্য ৩৬৯ কোটি টাকাসহ মোট ৫২১ কোটি টাকার প্রকল্প ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের ২৯ মার্চের সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ৫৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়, এর মধ্যে সরকারের ২০০ কোটি ৫ লাখ, ওয়াসার ১০ কোটি, প্রকল্প সাহায্য ৩৬২ কোটি ৯৫ লাখ।

চিহ্নিত করা দুর্নীতির প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশ করেছে দুদক।

দুদক মনে করছে, চলমান প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ অপচয় বন্ধে বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থার অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর সমন্বয়ে যৌথ পরিমাপ টিম ও মনিটরিং টিম গঠন করা যেতে পারে। এর ফলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারেরা প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে যথাযথভাবে করার বিষয়ে মনোযোগী হবেন। এতে সময়, অর্থ অপচয়, দুর্নীতি অনেকটাই কমে যাবে।

প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির সময় কাজের যথার্থতা ও উপযোগিতা আছে কি-না তা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে আগেই নিশ্চিত হতে হবে। বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যাতে অহেতুক না বাড়ানো হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটিতে দাতা সংস্থার প্রতিনিধিসহ টেন্ডার ও কেনাকাটা যথাযথ হচ্ছে কি-না তা মনিটরিং করার জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার প্রকল্প পরিদর্শনসহ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে।

ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের আগে কাজের সঠিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। ঠিকাদার যতটুকু কাজ করছে তার গুণগত মান যাচাইয়ের ওপরই তার বিল পরিশোধ করা উচিত।

ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ওয়াসা কর্তৃক ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেতে হবে। অবৈধ ওভারটাইম বিল রোধে ওয়াসার কর্মচারীদের জনবল কাঠামো সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। বেতনের সঙ্গে ওভারটাইম বিলের সমন্বয় সাধনসহ সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।

প্রকল্পকাজ বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা ওয়াসার কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমন: ঢাকা সিটি করপোরেশন, সওজ, বিদ্যুৎ বিভাগ ইত্যাদির সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয় প্রয়োজন।

ওয়াসার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আনার লক্ষ্যে গণমাধ্যম, দুদক, অডিট বিভাগসহ নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। সেবা গ্রহীতাদের নিয়ে মাঝে মাঝে গণশুনানির আয়োজন করা উচিত।

ওয়াসার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নাধীন অবস্থায় বিভিন্ন প্রকৌশলী সংস্থার বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত সার্ভিল্যান্স টিম কর্তৃক আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটায় প্রতিযোগিতামূলক প্রকাশ্য/ই-টেন্ডারিং, দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ সিনিয়র কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব দিতে হবে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বুয়েটসহ অন্যান্য পেশাদার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

এমবি