পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি। সন্দেহভাজন ৫ জনের নাম ঠিকানাও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। ৭১ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ী কেমিক্যাল গোডাউনের (গুদাম) মালিকদের দুই বছরেও শনাক্ত করা হয়নি।
বছরখানেক আগে পুলিশ ময়না তদন্তের প্রতিবেদন হাতে পায়। কিন্তু তদন্ত শেষ না হওয়ায় আদালতে চার্জশিট দেওয়াও সম্ভব হয়নি।
পুলিশ বলছে, ভুল নাম-ঠিকানা দিয়ে চুড়িহাট্টার হাজি ওয়াহেদ ম্যানশন ভাড়া নিয়ে কেমিক্যালের গোডাউন স্থাপন করা হয়েছিল। সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় তদন্ত শেষ করা যায়নি।
অভিযোগপত্রও জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। যাদের গাফিলতিতে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তাদের বিচার হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তাদের মধ্যে হতাশাও বিরাজ করছে।
চকবাজার থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার বলেন, মামলাটির তদন্ত চলছে। ভবনের মূল মালিককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে যাদের গুদাম ছিল তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তারা যে নাম-ঠিকানা দিয়ে ভাড়া নিয়েছিল সেগুলো সঠিক নয়। এখনো সঠিক নাম-ঠিকানা উদ্ধার করা যায়নি।
মামলা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আশিক উদ্দিন সৈনিক বলেন, ঘটনার দুই বছর পরও জড়িতরা শনাক্ত হয়নি। তারা আদৌ শনাক্ত হবে কি না তা বুঝতে পারছি না। আমরা চাই- যত দ্রুত সম্ভব জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টায় পারফিউমের ফ্যাক্টরি ও গোডাউনে অগ্নিদুর্ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারান। এর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৩ জন প্রাণ হারান।
নিমতলী ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর সরকারের পক্ষ থেকে আবারও একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
কিন্তু দুই বছর পরও পুরান ঢাকার পরিস্থিতি একটুও বদলায়নি। অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন সরাতে পুরান ঢাকায় অভিযান শুরু করে সেবা সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স। সে সময় শিল্প মন্ত্রণালয় কেমিক্যাল পল্লী স্থাপনের আগে সাময়িকভাবে গোডাউন সরাতে দুটি প্রকল্প নেয়। বিসিআইসির শ্যামপুরের উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরির জায়গা এবং টঙ্গীতে বিএসইসির জমিতে গোডাউন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
এক বছরের মধ্যে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু দুই বছর পরও সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিজ করপোরেশনের উদ্যোগে শ্যামপুরে ৫৪টি কেমিক্যাল গোডাউন নির্মাণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক লিয়াকত আলী বলেন, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করতে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে। আশা করছি এ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ করে।
এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। কমিটির প্রধান ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউনগুলো যত দ্রুত সম্ভব সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
এগুলো দ্রুত সরিয়ে নেওয়া না হলে হয়তো আরেকটি চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সরকারের সব সংস্থার সমন্বয়ে গোডাউনগুলো সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ এসিড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তারেক হোসেন বলেন, টঙ্গী ও শ্যামপুরে যে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে সেগুলোর কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে আমরা শুনিনি। সরকার শুধু জমি দেখিয়েছে। নিরাপদ পুনর্বাসন করলে আমরা সেখানে যেতে সব সময় প্রস্তুত আছি।
চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর সরকার মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ৩০৮ একর জমিতে বিসিক কেমিক্যাল শিল্পপার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ২০১৯ সালের ১০ জুন কেমিক্যাল শিল্পপার্ক স্থাপনের প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। শিল্পপার্ক প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০১৯ সালের জুনে ডিপিপি পাশ হয়েছে।
এরইমধ্যে ৩১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এখন মাটি ভরাটের কাজ শুরু করতে কিছু প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। এগুলো সম্পন্ন হলে এ মাসের শেষের দিকে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া সম্ভব। তিনি আরও বলেন, এক কথায় এর অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক।
এ প্রকল্প কবে নাগাদ শেষ হবে জানতে চাইলে সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা। কিন্তু করোনার কারণে কাজের ধীরগতি ছিল। ফলে একটু সময় বেশি লাগতে পারে। আশা করছি ২০২২ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটি মোটামুটি শেষ করা সম্ভব হবে।
আরমানিটোলার বাসিন্দা বলেন, আবাসিক ভবনে কেমিক্যাল গোডাউন ও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার সংখ্যা যেন বাড়ছে। বেশি ভাড়া পেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও বাড়ির মালিকরা গোডাউন ভাড়া দিচ্ছে।
এগুলো দেখার কেউ নেই। তিনি আরও বলেন, সরু গলিতে ভিড় ঠেলে দাহ্য পদার্থ আনা-নেওয়াসহ সবকিছু অবাধে চলছে।
এএস





