বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদই আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী। তাই বলা যায় তিনিই হচ্ছে দেশে ২১তম রাষ্ট্রপতি। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে আবদুল হামিদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুল হামিদ ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হাজী মোঃ তৈয়ব উদ্দিন এবং মাতার নাম তমিজা খাতুন।

আজ (বুধবার) রাতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। গণভবনে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠক হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সভায় সর্বসম্মতিক্রমে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দ্বিতীয় কোনো প্রার্থীর নাম আসেনি।

জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ। ফলে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি পদে বিজয়ী হবেন। তিনিই হবেন দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি।

আগামী ২৩ এপ্রিল বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হবে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি এ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ অবসানের পূর্ববর্তী নব্বই হতে ষাট দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সে হিসেবে আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।

সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য সংখ্যা ৩৬ জন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলটির কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার সংসদ সদস্যরা। ৩৫০ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ২৩২ জন।

এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এরইমধ্যে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংসদ সচিবালয়ে পাঠিয়েছে। গাইবান্ধা-১ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ শূন্য আসন বাদ দিয়ে বাকি ৩৪৮ জন এমপির নাম রয়েছে ভোটার তালিকায়।সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটারের অনুকূলে বিভক্তি সংখ্যা, ভোটারের নাম ও নির্বাচনী এলাকা উল্লেখ রয়েছে তালিকায়।

আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী— মনোনয়নপত্র দাখিলের তারিখ ও সময় ৫ ফেব্রুয়ারি, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র পরীক্ষা ৭ ফেব্রুয়ারি এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১০ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা পর্যন্ত।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রার্থীর সংখ্যা একজনের বেশি না হলে তাকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।

আর একাধিক প্রার্থী হলে সংসদের অধিবেশন কক্ষে বিধিমালা অনুযায়ী ভোট হবে। ওই আইনের সপ্তম ধারায় বলা হয়েছে— নির্বাচনী কর্মকর্তা নির্ধারিত দিন, সময় ও স্থানে মনোনয়নপত্র পরীক্ষা করবেন। একাধিক প্রার্থী হলে ১৮ ফেব্রুয়ারি সংসদের অধিবেশন কক্ষে নির্বাচনী কর্মকর্তা ভোটের আয়োজন করবেন। নির্ধারিত ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রার্থীর নাম লিখে নিজের সই দিয়ে তা জমা দেবেন এমপিরা।

আবদুল হামিদ নিকলি জি.সি হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে আইএ এবং বিএ পাস করেন। । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি একজন আইনজীবী হিসাবে তার পেশা শুরু করেন।

১৯৫৯ সালে আবদুল হামিদ ছাত্রলীগে যোগদানে মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক কর্মজীবন শুরু হয়। কলেজে পড়াশোনা করার সময় তিনি

১৯৬১ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক কারাবন্দী হন।

১৯৬২-৯৩ সালে তিনি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৫-৬৬ সালে একই ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।

তিনি ১৯৬৪ সালে কিশোরগঞ্জ উপ-বিভাগের ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। আবদুল হামিদ ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

১৯৭১ সালে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে, তিনি স্বাধীনতার পক্ষে জনগণের মতামত তৈরির জন্য পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র কিশোরগঞ্জের আন্দোলন শুরু করেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণার পর তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়ার জন্য ভারতের আগরতলাতে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে বড় চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লার অধিকাংশ সংসদ সদস্য সেখানে অবস্থান করছেন। আবদুল হামিদ তাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। এপ্রিলের শেষের দিকে, তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে এসে আরও মানুষ সংগঠিত করেন এবং ভারত ফিরে যান।

আবদুল হামিদ স্বাধীন বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৬-৭৮ তিনি কারাবন্দী করা হন। তিনি ১৯৭৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং ১৯৯০-৯৬ মেয়াদে কিশোরগঞ্জের জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন ৫ বার।

১৯৭০ সালের পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাফেলেশন নির্বাচনে ময়মনসিংহ -১৮ আসন থেকে সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে তিনি সংবিধান পরিষদের সদস্য হন। ১৯৭৩,১৯৮৬,১৯৯১,১৯৯৬,২০০১ এবং ২০০৯ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আবদুল হামিদ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকারের দায়িত্বও পালন করেন।

জেড