আমাদের দেশে বর্তমানে শ্রবণ প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৩০ লাখ। তাদের জন্য সমঅধিকার বিষয়টি কেবল-কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। প্রতিটি পদক্ষেপেই তারা বঞ্চিতদের দলে। শিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরি পর্যন্ত—সবকিছুতেই তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ফরিদপুর, চাঁদপুর ও সিলেটে মোট সাতটি শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে।

সাতটি বিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা ৬২০টি হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরও অনেক বেশি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার। পাশাপাশি মূলধারার বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের সেতু তৈরি করা দরকার।

এদিকে, চাকরির ক্ষেত্রেও তারা নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির চাকরিতে শতকরা ১ শতাংশ এবং অন্য চাকরিতে এতিম ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ১০ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও ফাঁকিটা এখানেই বলেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বিষয়টি একেবারেই পরিষ্কার নয়, এটি একটি বড় সমস্যা। এখানে এতিম ও প্রতিবন্ধী বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে, বিষয়টি নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে যারা চাকরি পান, তারাও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের যথাযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না, তারা কর্মস্থলে ডেস্ক পান না, বিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়েছেন অথচ ক্লাস পাচ্ছেন না—এমন সমস্যা রয়েছেই। এগুলো আমাদের সামাজিক সমস্যা, মানসিকতার সমস্যা।

সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজঅ্যাবেলিটির (সিএসআইডি) নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা আমাদের প্রতিটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিছুদিন আগেও তারা উচ্চশিক্ষায় যেতে পারতেন না, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ (ইশারা ভাষা) একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এ জায়গায় বড় একটি পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই এখন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত যেতে পারছে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিষয় হলো, আইসিটি (তথ্য প্রযুক্তি) সেক্টরে তারা খুব ভালো করছেন। তারা গার্মেন্টস, লেদার সেক্টর এবং আইসিটি সেক্টরে বেশ ভালো করছেন, এটা একটি পজিটিভ বদল। তবে, এখনও যেটা সমস্যা সেটি হচ্ছে, এখনও যেহেতু তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা মেইন স্ট্রিমিং এডুকেশন নয়, সরকারি স্কুল-কলেজগুলোয় শিক্ষকরা এখনও সাইন ল্যাংগুয়েজে সে রকম প্রশিক্ষণ পাননি তাই তাদের সঙ্গে কমিউনিকেশন একটি বড় সমস্যা।

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা থাকলেও লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করার পরেও প্রতিবন্ধীদের চাকরি না পাওয়া নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলাও বিভিন্ন সময়ে হয়েছে যেগুলোর কয়েকটি এখনও বিদ্যমান।

বিসিএস দিয়ে চাকরি পাওয়ার পরও একটি মন্ত্রণালয়ে কাজ না পাওয়ার ঘটনায় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে বিষয়টি দেখতে হয়েছে—এমন ঘটনাও ঘটেছে আমাদের দেশে মন্তব্য করেন খন্দকার জহুরুল আলম।

 

আবুল আহাদ নামের একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী বলেন, আইনে সবার সমান অধিকারের কথা বলা আছে, সব স্কুলে তাদের ভর্তি নিতে হবে, সাইন ল্যাংগুয়েজ শেখাতে হবে, বলা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে এ সবের প্র্যাক্টিস নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যে শিক্ষণ পদ্ধতি, সেখানে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এখনও। এ কারণে প্রচলিত বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে এসব স্পেশালাইজড শিশু বিড়ম্বনার শিকার হয়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনে-দিনে শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তবে, এ নিয়ে কোনও গবেষণা নেই।

সাধারণভাবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পক্ষে এটা করাও সম্ভব নয় জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, আমাদের পক্ষে এটি করাও সম্ভব নয়, এটি মেডিক্যাল সাইয়েন্সের একটি বিষয়। কিন্তু এটার একটি গবেষণা হওয়া উচিত। মেডিক্যাল টিম এবং যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করে তাদের একটি যৌথ গবেষণা বিষয় হওয়া উচিত। আরেকটি বিষয় হলো, সবসময়ই তারা ছিল, তবে আগে যেহেতু সমাজে কোথাও তাদের অংশ গ্রহণ ছিল না, শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না, কোথাও চাকরির ব্যবস্থা ছিল না, তাই বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল, এখন দিন বদলের সঙ্গে-সঙ্গে তাদের অংশগ্রহণ কিছুটা বাড়াতে এখন বিষয়টি সামনে এসেছে।

এদিকে, মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের সাইন ল্যাংগুয়েজে প্রশিক্ষণ দিতে হবে অন্তত তারা যেন শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগটা স্থাপন করতে পারেন এটা নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা সহজলভ্য নয় সে কারণে তাদের জন্য বিশেষ ভোকেশনাল শিক্ষা ব্যবস্থা করাটা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে এ বিষয়ে যে আইনটি রয়েছে, সেটির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা উচিত।

শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি ২০১০ সাল থেকে বলা হলেও তার বাস্তবায়ন আমরা দেখছি না। আবার সরকারি চাকরিতে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে কোটা থাকলেও যথাযথভাবে মেনে চলা হয় না। প্রতিবন্ধী কোটায় সাধারণত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীদের গুরুত্বটাই বেশি দেওয়া হয়।

 

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইশারা ভাষার সংবাদ উপস্থাপক ও ইশারাভাষা প্রশিক্ষক আরাফাত সুলতানা লতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শারীরিক এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা যতটা নিজের কথা নিজে বলতে পারেন সে তুলনায় শ্রবণ প্রতিবন্ধীরা কিন্তু নিজেদের কথা বলতে পারেন না, তাদের কথা বলতে হলে আরেকজনের সাহায্য নিতে হয়।

নিজের কথা নিজে বলতে না পারা একটি বড় সমস্যা। আরেকটি বিষয় হলো শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সাহায্যকারী খুব ভালো দোভাষীর সংখ্যা আমাদের দেশে অনেক কম।

তার বেশিরভাগই হলো, রাজধানীকেন্দ্রিক। শিক্ষাগত দিক থেকেও শ্রবণপ্রতিবন্ধীরা অনেক পেছনে। শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অনেকেই উচ্চতর শিক্ষায় যেতে পারছেন কিন্তু শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সে সুযোগ এখনও পাচ্ছে না।

খুব হাতেগোনা কয়েকজন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করতে পারছেন। আর সরকারি চাকরিসহ ভালো চাকরি পেতে হলে উচ্চশিক্ষা এখন বড় বিষয়, কিন্তু তারাতো সুযোগটাই পাচ্ছে না।

লতা বলেন, সরকার যদি খুব ভালো যারা শ্রবণপ্রতিবন্ধী রয়েছেন তাদের প্রশিক্ষণ দিতেন তাহলে তারা উচ্চশিক্ষাসহ চাকরির সুযোগ পেতেন।বৈষম্যের শিকারতো তারা হচ্ছেনই তারা তো চাকরিই পাচ্ছে না।

সরকারি চাকরি তো বাদই দিলাম বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও তাদের সুযোগ দিলে যে তারা কাজ করতে পারেন, সেটাও তো হচ্ছে না, তারা তো সুযোগই পাচ্ছে না কাজ করার।মানুষ ভাবে, তারা কথা বলতে পারে না, বোঝাতে পারে না। সুতরাং কী দরকার! তারচেয়ে কম শিক্ষিত কাউকে তারা সেখানে নিয়ে নিচ্ছেন।    

সমাজসেবা অধিদফতর থেকে জানা গেল, সারাদেশে যারা নিবন্ধিত শ্রবণ প্রতিবন্ধী রয়েছেন তারাই কেবল সরকারি সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন, বাকিরা পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে সারাদেশে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা হালনাগাদ করা জরুরি বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নূরুল হক বলেন, উপযুক্ততা থাকলে কোটা পূরণ হওয়ার কথা। কারণ বিষয়টি নিয়ে সবাই অনেক বেশি সচেতন। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ অনেক বেশি শক্তিশালী।আইনের আওতায় সবাই। যদি কোথাও বৈষম্য হয়, তাহলে আইন দ্বারাই তার শাস্তির বিধান রাখা আছে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ সরকারের একার পক্ষে সেটি সম্ভব নয়।-বাংলা ট্রিবিউন।

ওএফ