কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হালিমা খাতুন ও হাসিবুর রহমান। অর্থাভাবে দরিদ্র কৃষক পরিবারের এই দুই কৃতি শিক্ষার্থীর পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অনেক কষ্টে নিজেদের সহায় সম্বল বিক্রি করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করলেও এখন দামী বই, খাতা, হোষ্টেল ফিসসহ নানাবিধ খরচ যোগাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার চকপুস্তুম গ্রামের দারিদ্র কৃষক আব্দুল হান্নান ও নাজিরা বেগমের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে বড় হালিমা খাতুন। এবার সারাদেশের সরকারী মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধা তালিকায় রাজশাহী ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়।
গরীব কৃষক হান্নান মেয়েকে রাজশাহী ডেন্টাল কলেজে ভর্তির জন্য নিজের একমাত্র সম্বল আধা বিঘা কৃষি জমি বিক্রি করে দেন। ডেন্টালে ভর্তি হওয়ার পর মাইগ্রেশনের মাধ্যমে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ হয় হালিমা খাতুনের। পিতার শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেও এখন অর্থাভাবে পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
পাড়া প্রতিবেশীর সহযোগিতায় ১০ হাজার টাকা নিয়ে কুষ্টিয়ায় ভর্তি হওয়ার জন্য ট্রেন যোগে আসার পথে সেখানে পাশের সিটে বসা বাংলাদেশ ব্যাংকের দু'জন কর্মকর্তার সাথে তার পরিচয় হয়।
শিক্ষাথী হালিমা বলেন, চকপুস্তম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই মেডিকেল পড়ার ইচ্ছে জাগে। হোগলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরিক্ষায় গোল্ডেন-জিপি-৫ এবং নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।
দারিদ্রতা সত্বেও কঠোর অধ্যাবসায় আর অদম্য ইচ্ছা শক্তির কারণেই ভাল ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পেরে দারুন খুশি হালিমার পরিবার এবং এলাকাবাসী। মেডিকেল কলেজে ভর্তির খরচ জোগাতে পারলেও এখন পড়ালেখার খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
হালিমা জানান, বই, খাতা ক্রয়, হোষ্টেল খরচ মেটানো আমাকে অতিরিক্ত সময়ে টিউশনি ছাড়া উপায় নেই। অনেক চেষ্টার পরও এখন পর্যন্ত টিউশনি জোটাতে পারেনি। অর্থাভাবে মেডিকেল শিক্ষা জীবন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
একই মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাসিবুল হাসান। বাড়ি বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার ধর্মকুল গ্রামে। বাবা আশরাফুল একজন বর্গা চাষী। ভিটামাটি ছাড়া তাদের আর কোন জমি নেই। অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করে অনেক কষ্টে হাসিবুলের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন।
হাসিবুল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় বাবা-মার পাশাপাশি গ্রামবাসীও দারুণ খুশি। অনেক কষ্টে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও অর্থাভাবে এখন পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শিক্ষার্থী হাসিবুল জানায়, ধর্মপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৫ম শ্রেণীতে গোল্ডেন জিপিএ-৫, কুবপুর দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং বগুড়া সরকারী আজিজুল হক কলেজ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ইচ্ছে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী গ্রহণ করা।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. ইফতেখার মাহমুদ জানান, হালিমা এবং হাসিবুল দারিদ্র কৃষক পরিবারের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। তাদের লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী করতে পারলে খুবই ভাল ফলাফল করতে পারবে। কিন্তু আর্থিক অনটন বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, কলেজ থেকে তাদেরকে কিছু বই দেয়া হয়েছে। কলেজের শিক্ষক ডা. আক্রামুজ্জামান মিন্টু তাদের এপ্রোনের খরচ দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে তাদের ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। টিউশনি করলে কিছুটা সুফল পেলেও লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হবে।
তিনি হালিমা এবং হাসিবুলের পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহবান জানান।
এআর





