দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান কেবল ঘুষ ও দুর্নীতিসম্পৃক্ত মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধ বিষয়ে এককভাবে কাজ করতে পারে। অন্যান্য বিষয়ে তার হাত বাঁধা রয়েছে।

সোমবার সেগুন বাগিচার প্রধান কার্যালয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুদকের কৌশলপত্র-২০১৯ এর ওপর এক মতবিনিময় সভায় তিনি একথা জানান।

অনুষ্ঠানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, বাংলাদেশের প্রধান দুঃখ দুর্নীতি। দুর্নীতির বিষয়ে হতাশা বিশাল। আর দুদকের কাছে মানুষের গগনচুম্বী প্রত্যাশা। দুদক কাজ করছে। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে সব বিষয়ে তৈরি হচ্ছে। আস্তে আস্তে রাষ্ট্র শক্ত অবস্থানে আসছে। তবে রাতারাতি সব হয় না। এক দিনে করা কঠিন।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, দুদকের প্রতি জনগণের আস্থা জাগে নাই। তাই দুদককে অবিলম্বে দৃশ্যমান কিছু ঘটনা ঘটিয়ে দেখাতে হবে। কয়েকটি কাজ করেছে ইতিমধ্যে। তবে জনগণকে আস্থায় আনতে অন্তত ২০টি ঘটনা ঘটিয়ে একটি ম্যাসেজ দিতে হবে, যাতে মানুষ মনে করে অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন বলেন, কমিশনের মিশনে ‘দুর্নীতির গতি-প্রকৃতি নির্ণয়’ থাকা উচিত। কাজের মধ্যে স্বচ্ছতার দৃশ্যমান মানদণ্ড থাকবে। স্বচ্ছতা আপেক্ষিক। তাই এর একটি মানদণ্ড থাকা উচিত। কমিশনের প্রতি মানুষের ভয় ও শ্রদ্ধা থাকলে দুর্নীতি প্রতিরোধ কিছুটা সহজ হবে।

তিনি স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা খাতে দুদকের দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, চিকিৎসকদের প্যাথলজিক্যাল টেস্ট এবং ওষুধের স্যাম্পল মাইন বোমের মতো ভয়ংকর হয়ে উঠছে।

ফরাসউদ্দিন বলেন, দুদক অনেক কাজ করছে, কিন্তু ভাবমূর্তির উন্নয়ন হচ্ছে না। ভাবমূর্তি বাড়াতে বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে যদি সীমাবদ্ধতা থাকে, সেগুলো কাটানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজনীতিতে দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান থাকলে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচিত দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা মুক্ত থাকলে দুর্নীতি দমন হবে অবাস্তব চেষ্টা। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যাতে দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়স্থল না হয়। দুদকের উচিত, বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

সিপিডির সাবেক নির্বাহী পরিচালক, অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দুর্নীতি দমনকে আইনি প্রক্রিয়ায় না দেখে, এটিকে উন্নয়নের প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দুর্নীতি দমন করা না গেলে ২০৪১ সালের উন্নত দেশ বিনির্মাণ কঠিন হবে। তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে প্রচুর অর্থ পাচার হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী কোচিং বাণিজ্য বন্ধে দুদকের সক্রিয় ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকারের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে দুদকের তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। ব্যাংকিং খাত নিয়ে দুদকের তৎপরতা নিয়ে এরই মধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দুদককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার মো. জমির বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি হবে। কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে শিক্ষা ক্ষেত্র এখন পয়সা উপার্জনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার মানের চরম অবনতি ঘটছে।

যদি সক্ষম এবং দক্ষ শ্রমশক্তি না থাকে, তাহলে এ দেশে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার বিনিয়োগ আসবে না। বাংলাদেশকে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি স্কুল, কলেজে দুদকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

মো. জমির আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্যাথলজিক্যাল টেস্টের কমিশনের অর্থ চিকিৎসকদের পকেটে যাচ্ছে। এখানে শ্যাডো এরিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দুদকের এদিকেও নজর দেওয়া উচিত। দুদকের মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, দুর্নীতির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, এমন অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে যাতে সবাই অনুধাবন করেন, কেউ-ই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

সাবেক মন্ত্রী মীজানূর রহমান শেলী বলেন, রাজনৈতিক দুর্নীতি দমনে কমিশনকে আরও কাজ করতে হবে। ক্ষমতা এবং শক্তির উৎসেই আঘাত করতে হবে ।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, বড় দুর্নীতি আগে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন।

নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দুদকের উচিত মেগা খাতের দুর্নীতি দমনে বেশি মনোযোগ দেওয়া। তিনি দুদকের মতো সার্বিকভাবে সরকারের একটি কৌশলপত্র প্রণয়নের সুপারিশ করেন।

গণমাধ্যম বিশ্লেষক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কর্মচারীদের বড় বড় দুর্নীতি বেরিয়ে আসছে। এসব ক্ষেত্রে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সচিবদের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই? নতুন তিনটি ব্যাংক অনুমোদনের সমালোচনা করে তিনি এ বিষয়ে দুদককে তদন্তের আহ্বান জানান।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

বেসরকারি সংগঠন এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান দুদক, তথ্য কমিশন এবং সিএজির মধ্যে সমন্বয়ের পরামর্শ দেন।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘এখন আমরা অনেক শক্তিশালী। অনেক বেশি শক্তিমান। কারণ দুর্নীতি দমনে সরকারপ্রধান জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরাও শিগগির নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করব।’

দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা কমিটমেন্ট জরুরি। যদিও গত তিন বছর কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি আমার অফিসে এসে দম্ভ দেখাননি। আপনারা বলতে পারেন আমি ব্যক্তিগতভাবে পক্ষপাত করেছি। আমার লোকেরা পয়সার বিনিময়ে অনুকম্পা দেখিয়েছে—আপনারা এটা বলতেই পারেন। আমরা কেউ-ই ধোয়া তুলশীপাতা নই। আমাদেরও ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে।’

লাখো অভিযোগ ১০৬ নম্বরে
ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকের ৫৬টি মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে আরও মামলাও হতে পারে। ব্যাংকার, ব্যবসায়ী যারা আসামি, তারাও দ্রুত মামলার চার্জশিট চান। আমরা চেষ্টা করছি। তবে, ব্যাংকের টাকাটা কিন্তু জনগণের। জনগণের টাকা ব্যাংকে ফিরে আসুক এটা জনগণ চায়।

আপনারা জেনে খুশি হবেন, বেসিক ব্যাংকের প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যাংকে নগদ জমা হয়েছে। কমিশনের মামলার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে চুরি হওয়া কয়েক হাজার কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। আমরা অপরাধীদের পেছনে নিরবচ্ছিন্নভাবে আইনি অভিযান অব্যাহত রাখব। কাউকেই ছাড় দেব না।’

তিনি বলেন, ‘দুদক অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী। কারণ, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গীকার আমাদের কাছে এসেছে। দেশের সরকার প্রধান বলেছেন— দুর্নীতি সমস্যা। এর লাগাম টেনে ধরতে হবে এবং একে দমন করতে হবে। আশা করি, সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হব।’

মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন দুদক কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক খান, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দীন আহমেদ, সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির, আবদুর রশীদ, কণ্ঠশিল্পী হায়দার হোসেন প্রমুখ।

এএস