১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর, এই দিনে মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম কামান্নায় পাক-বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন মাগুরার ২৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মাগুরা সদর উপজেলার হাজিপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা ওই ২৭ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে সে সময় কামান্না গ্রামে একাধিক গণ-কবরে সমাহিত করা হয়।

সে রাতে শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশের বাড়ি মাগুরা সদর উপজেলার হাজিপুর অঞ্চলের শ্রীমান্তপুর, আলিধানি, হৃদয়পুর, মির্জাপুর, শিবরামপুর গ্রামে। দিনটি এলেই এলাকার শহীদ পরিবারগুলো স্বজন হারানোর সেই শোকে আজও কাতর হয়ে পড়েন। কামান্নার শহীদদের স্মরণে তাদের নিজ এলাকা হাজিপুরে নির্মিত হয়েছে একটি শহীদ মিনার। যেখানে ২৬ নভেম্বর কামান্না শহীদদের স্মরণে প্রতি বছর নিজেদের উদ্দ্যোগে মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভার আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে শহীদ পরিবারের সদস্য, কামান্নাবাসীসহ জেলার মুক্তিযোদ্ধারা কামান্না শহীদ দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের দাবী জানিয়ে আসলেও স্বাধীনতার এতো বছর পরে আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

কামান্না যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া হাজীপুর আঞ্চলিক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর রাতে শৈলকুপা থানা সদরকে হানাদারমুক্ত করার উদ্দেশ্যে মাগুরা হাজীপুর এলাকার আঞ্চলিক বাহিনী, মুজিব বাহিনীসহ কয়েকটি গেরিলা বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধার দল কামান্না গ্রামে রাত্রি যাপনের জন্য স্কুলের পাশে অবস্থিত মাধব কুন্ডু নামের ভারতে পালিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির পরিত্যক্ত বাড়ির বড় টিনের ঘরে ৩২ জন ও পাশে ছামেলা বেগমের দুটি খড়ের ঘরে ৫ জন করে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেন।

গ্রামের মানুষের সহায়তায় রাতের খাবার খেয়ে শেষরাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েন ক্লান্ত ৪২ থেকে ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধার দলটি। এর আগে মুজিব বাহীনির মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের মাঝে মনোমালিন্যতায় সৃষ্ট রাগ আর অভিমানের কারনে রাতের খাবার না খেয়ে ওই রাতেই মাধব কুন্ডুর বাড়ি ত্যাগ করে নদী পাড়ি দিয়ে ফাদিলপুর এলাকার দিকে অগ্রসর হয়।

কামান্নায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের এ খবর স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে পৌছে যায় ঝিনাইদহের শৈলকুপা ও মাগুরার পাক বাহিনীর ক্যাম্পে। খবর পেয়ে রাজাকার আলবদর বাহিনীর সহযোগিতায় শৈলকুপা ও মাগুরা থেকে আসা পাক হানাদার বাহিনির দল ২৬ নভেম্বর ভোর রাতে চারদিক থেকে ঘিরে ঘুমন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ করলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন তারা, এ সময় ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সাথে তাদের সহায়তাকারী ওই গ্রামের রঙ্গবিবি ও ফনিভুষন কুন্ডু নামের আরও দুজন মারা যান।

পাক সেনারা চলে যাবার পর এলাকাবাসী এসে মাধব কুন্ডুর বাড়ির ঘরের ছাদে, বারান্দায়, উঠানে, খড়ের গাদাসহ বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান, কেউ বা রক্তের মাঝে ছটফট করে পানি পানি বলে চিৎকার করে কাতরাচ্ছেন তখনও।

এ দুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে চারদিক, আশে পাশে থাকা মুক্তিযোদ্ধার দল অগ্রসর হয়ে চলে আসে কামান্নায়, সকাল হতেই শোকের ছায়া নেমে আসে চারদিক, খবর পেয়ে কারো কারো স্বজনরাও ছুটে আসেন সেখানে। লাশগুলি কামান্না স্কুল মাঠের পাশে ৫ টি গণকবরে (৬ জন করে ২ টি ও ৫ জন করে ৩টি করে) ২৭ বীর শহীদকে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হয়। ইতিহাসের নৃষংস সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আজও তা আছে।

সেদিনের সেই ২৭ বীর শহীদের স্বরনে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি শহিদ মিনার। কামান্না গ্রামের “২৭ শহীদ সৃতি সংঘ” নামে গঠিত ক্লাবের আয়োজনে সেখানে প্রতিবছর মাগুরার সেই সকল শহীদদের পরিবার পরিজনের উপস্থিতিতে মিলাদ ও দোয়া মহফিলের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

শহীদ পরিবারের সদস্য, নতুন প্রজন্ম ও মুক্তিযোদ্ধারাও বলেছেন, দেশ মাতৃকার জন্য ২৭ বীর এই মুক্তিযোদ্ধারা জীবনদান করলেও এখন পর্যন্ত রাশটীয় রাষ্টীয়ভাবে এ দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ দিনটিকে সরকারিভাবে কামান্না শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের জোর দাবী জানান তারা।

তবে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড বলেন, দীর্ঘ দিন যাবত রাষ্ট্রীয়ভাবে কামান্না যুদ্ধে শহীদের শাহাদৎ বার্ষিকী পালন ও দিনটিকে কামান্না শহীদ দিবস ঘোষণার জন্য তারা কেন্দ্রিয় কমান্ড কাউন্সিল ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে আবেদন জানিয়ে আসছেন তারা।

সাইফুল্লাহ/এমবি