“অ ভাই আমারে এক গললাস (গ্লাস) পানি দেওরেবা, আমার গলা হুকাইগেছে (শুকিয়ে গেছে), আর আমারে মারিও না, আমার আত-পাও ভাংগি গেছে (হাত-পা)” এত সব কথা বলার পরও মন গলেনি পাষন্ড খুনীদের।

গত ৮ জুলাই সিলেট-সুনামঞ্জ রোডের কুমারগাঁও বাসস্টেশন এলাকার বড়গাঁওস্থ সুন্দর আলী মার্কেটের একটি ওয়ার্কশপের সামনে বারান্দার খুঁটিতে বেঁধে রেখে নির্যাতনে নিহত রাজনের এমন আহাজারিতে আশ-পাশের অনেকেরই চোখের পানি গড়িয়ে পড়লেও হৃদয়ে এতটুকু দয়ার উদ্রেক হয়নি মানুষরুপী কয়েকটি নরপশুর।

ঐ দিন সকাল সাতটার দিকে শিশুটিকে এমন নির্যাতন করে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়। তখনওপর্যন্ত সেটি গুমই ছিল। রাত ১১টার দিকে একটি মাইক্রোবাস থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে বুধবার রাত ১১টায় থানায় গিয়ে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন।

নিহত রাজন কুমারগাঁও বাসস্টেশন সংলগ্ন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, ইউটিউব’এ রাজনকে নির্যাতনের এমন দৃশ্য প্রচারের পর সিলেটে নগরীতে চলছে তোলাপাড়। বিভিন্ন মহল থেকে দাবী উঠছে ঘাতকদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির। কিন্তু পুলিশের কাছে জব্দকৃত শিশু রাজনের নির্যাতনের ২৮মিনিটের ভিডিও ফুটেজে এই করুণ দৃশ্য দেখা গেছে।

ভিডিওটি এতটাই নির্মম আর পৈশাচিক, সিনেমার ভিলেনরাও এই নিপীড়ন দেখে আঁতকে উঠবে। কিন্তু নিষ্ঠুর নির্যাতনকারীদের মনে তার জন্য এতটুকুও মায়া হয়নি। তারা তাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি,তাকে অজ্ঞাত স্থানে ফেলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু জনতা দেখে ফেলায় ঘাতকদের গাড়ীসহ আটক করে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় রাজনকে নির্যাতন করছে আর ঘাতকরা বলেছে, ‘তরে এমন শিক্ষা দিমু, হালার হালা (শালার শালা) জীবনে আর চুরি খরতে (করতে) ফারতে (পাড়বে) নায় (না)’। ঠিকই জীবন দিয়ে চুরির অপবাদের মূল্য দিয়েছে শিশুটি। কণ্ঠস্বর ও চিত্র থেকে অনুমেয় ৫/৬জন ঘাতক মিলে এই শিশুটিকে নির্যাতন করে।

লোমহর্ষক এই নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ফেসবুক-ইউটিউবের মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। গোপন কারও তোলা ভিডিও নয়। খোদ নির্যাতনকারীরাই সেটি পরিকল্পিতভাবে তুলে এবং উল্লাস করতে করতে তার ভিডিওধারণ করেছে। ‘লাইভ নির্যাতনের’ এই ভিডিওটিও তারা আবার নিজেরাই ফেসবুকে আপলোড করেছে।

নির্যাতনকারীদের যে সঙ্গী ভিডিও ধারণ করছিল, তাকে উদ্দেশ্য করে নির্যাতনকারীরা জানতে চায়, ঠিকমতো ভিডিও ধারণ হচ্ছে কি-না। ‘ফেসবুকে ছাড়ি দিছি, অখন সারা দুনিয়ার মানুষ দেখবৃ’ জবাব দেয় ভিডিওধারণকারী।

রাজনকে তারা নির্যাতন করে হত্যা করেছে চুরির অপবাদে। সিনেমাটিক স্টাইলে চলা অই নির্যাতনের সময় শিশুটির স্পর্শকাতর অঙ্গে বারবার খোচানো হয়েছে। রোলার দিয়ে সেখানে অশ্লীল ইঙ্গিতসূচক ঘা ও আঘাত করা হয়েছে। এইসময় নির্যাতনস্থলের বন্ধ মার্কেটের একটি পিলারের সাথে তাকে পিচমোড়া করে বেধে রাখা হয়েছিল। বাধন খুলে মাটিতে ফেলেও তাকে নানা ‘সিস্টমে’নিপীড়ন করতে দেখা গেছে।

টানা ২৮ মিনিটের ওই ভিডিও চিত্রের প্রতি মুহূর্তের নির্যাতনের নানা ’সিস্টম’ পরিলক্ষিত হয়েছে। নির্যাতন সইতে না পেরে শিশুটির আর্তচিৎকারের সময়, সিনেমার মত অট্টহাসিতে ফেটে উঠে ঘাতকরা। আঘাত করতে করতে তারা ঘেমে উঠেছে। সেগুলো সয়ে যাওয়া শিশুটি যখন ‘পানি’ খাওয়ার জন্যে তাদের বারবার অনুনয় করেছে, তখন নির্যাতনকারীরা বলছে, ‘ঘাম’ খা।

কয়েক মিনিটের জন্য রাজনকে হাতের বাঁধন খুলে রশি লাগিয়ে হাঁটতে দেওয়া হয়। ঘাতকরা ভেবেছিল, এত নির্যাতনের পর তার আর হাটার শক্তি নেই। সে মাটিতে ধপ করে পড়ে যাবে। কিন্তু ভয়ে হাটতে থাকা শিশুটিকে উদ্দেশ করে তখন তারা বলে, ‘আড়গোড় (হাড়গোড়) দেখি এখনো ঠিক আছে, ইগুরে (ওকে) আরও মারো’

এরপর রাজনের বাঁ হাত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে আরেকদফা পেটানো হয়। এইভাবে দফায় দফায় শিশুটির নখে, মাথা পেট ও উড়োসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে রোল দিয়ে আঘাত করা হয়। এক সময় বাঁ হাত ও ডান পা ধরে মুচড়াতেও দেখা যায়।

শেষ দিকে রাজন যখন লুটিয়ে পড়ে তখন নির্যাতনকারীদের একজন সঙ্গীদের কাছে জানতে চান, ‘কিতা করতাম?’ অপর নির্যাতনকারী বলেন, ‘মামায় যে কইছন, ওই কাম করি ছাড়ি দে!’

খুন হওয়া শিশু রাজনের পিতা আজিজুর জানান- তিনি যেদিন ভাড়ায় মাইক্রোবাস চালাতে পারেন না, সেদিন সংসার খরচ চালাতে সবজি বিক্রি করতে বের হয় রাজন।

মা লুবনা আক্তার জানান- ওইদিন (৮ জুলাই) রাজনের বাবা গাড়িতে (ভাড়ার ট্রিপে) ছিলেন বলে বাড়ি ফিরেননি। ভোরে টুকেরবাজার থেকে সবজি নিয়ে বিক্রির জন্য রাজন বের হয়েছিল। সারা দিন ছেলের খোঁজ পাননি তারা। রাতে থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার সময় এক কিশোরের লাশ পাওয়ার সূত্র ধরে রাজনকে শনাক্ত করা হয়।

লুবনা,বলেন- ‘আমার পুয়া (ছেলে) চোর না, ই কথা সারা এলাকার মানুষ জানে। প্রবাসী অখলতের চোর ধরার সখ পূরণ করতে গিয়া জীবন দিছে! আমি এর উচিৎ বিচার চাই।’

এদিকে, নির্মম এ হত্যাকান্ডের পর থেকেই জালালাবাদ থানায় চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। হত্যার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠছেন এলাকাবাসীও। হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবিতে স্থানীয় এলাকাবাসী কুমারগাঁও বাইপাস এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে।

এ ঘটনায় রাজনের পিতা বাদি হয়ে জালালাবাদ থানায় একটি হত্যা মামলা (নং-২৯৭/১৫) দায়ের করেন। ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে আটক মুহিত আলমকেও।

জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেন বলেন ‘নির্যাতন ভিডিওচিত্রে ধারণ করার বিষয়টি শুনেছি এবং এটি দেখেছেন-এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথাও হয়েছে।’

ওসি জানান- ঘটনার সঙ্গে মামলার আসামি চারজনই সম্পৃক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিওচিত্র ধারণসহ পুরো ঘটনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুহিতকে আদালতে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। সোমবার আদালতে রিমান্ড আবেদনের শুনানি হবে।

আসামির বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন
এদিকে, সিলেটে কিশোর শেখ সামিউল আলম রাজন (১৪) হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি মুহিত আলমের বিরুদ্ধে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

রোববার (১২জুলাই) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগরীর জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন আসামিকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (২য়) আদালতে হাজির করে এই রিমান্ড আবেদন করেন।

গত মঙ্গলবার (০৮ জুলাই) বেলা পৌনে ১টার দিকে হত্যার পর মাইক্রোবাস যোগে (ঢাকা মেট্টো-চ-৫৪-০৫১৬) কিশোর রাজনের মরদেহ গুমের চেষ্টার সময় মুহিত আলমকে আটক করে জালালাবাদ থানার পুলিশ। আটকের পর পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় জবানবন্দিতে কিশোর রাজন হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দেয় সে।

নিহত রাজন কুমারগাঁও বাসস্টেশন সংলগ্ন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদে আলী গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে।

এ ব্যাপারে জালালাবাদ থানার পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় থানার ওসি (তদন্ত) মো. আলমগীর হোসেনকে। মামলায় গ্রেফতার হওয়া মুহিত আলম ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন তার ভাই কামরুল ইসলাম, সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়না।

এর আগে, রাজনের লাশ গুমের সময় হাতেনাতে মুহিত আলমকে (২২) আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় লোকজন। মুহিতসহ চারজনকে আসামি করে জালালাবাদ থানায় হত্যা মামলা করেছেন রাজনের বাবা।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন মুহিতের বড় ভাই সৌদি আরব প্রবাসী কামরুল ইসলাম (২৪), তাঁদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী (৩৪) ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়না (৪৫)। 

কেবি