ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন আমাদের ভাষা শহীদদের সেই মহান ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদদের আত্মত্যাগের চিত্র ভেসে ওঠে আমাদের স্মৃতিপটে।
শুধু মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য এ দেশের সূর্য সন্তানেরা যেভাবে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীতে তার দৃষ্টান্ত আর নেই। সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বাররা সেদিন মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে নিজেদের জীবন দিয়ে আমাদের মধ্যে অমর হয়ে আছেন।
তাদের মহান ত্যাগেই আমরা পেয়েছিলাম মাতৃভাষা বাংলায় রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। এবং পরে ২১ ফেব্রুয়ারি পেয়েছে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রভাষা দিবসের মর্যাদা। মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে এ অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
শহীদদের জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭’র উদ্বোধন হবে আজ। উদ্বোধন উপলক্ষে ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
আজ বিকেল ৩টায় গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধন শেষে গ্রন্থমেলা পরিদর্শনে যাবেন তিনি। উদ্বোধন অনুষ্ঠানেই প্রদান করা হবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬।
এমিরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লেখক-গবেষকসহ বিভিন্ন জ্ঞানীগুণী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত থাকবেন।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও একাডেমি সম্মুখস্থ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় চার লাখ বর্গফুট জায়গা জুড়ে এ গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হচ্ছে। সে লক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ১২টি অংশে ভাগ করে সাজানো হয়েছে বইয়ের স্টলগুলো।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮০টি প্রতিষ্ঠানকে ১১৪টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৪৯টি ইউনিট অর্থাৎ, মোট ৪০৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৬৩টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ১৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের ১৫টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই ৩০ শতাংশ কমিশনে এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে বলে জানা যায়।
গ্রন্থমেলায় টিএসসি, দোয়েল চত্বর দিয়ে দু’টি মূল প্রবেশপথ, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিনটি পথ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার আটটি পথ থাকবে।
এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য একটি দৃষ্টিনন্দন সুপ্রশস্ত গেট নির্মাণ করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া মেলায় আগতদের বসার স্থানসহ নান্দনিক ফুলের বাগানও নির্মাণ করেছে তারা।
বরাবরের মতো এবারো গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে মেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। এবার মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিরাপত্তাকর্মীবৃন্দ। নিশ্চিদ্রনিরাপত্তার জন্য মেলায় আড়াই শ’ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণ ও পাশের এলাকার নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে বলে জানা যায়।
৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রয়েছে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সমকালীন প্রসঙ্গ এবং বিশিষ্ট বাঙালি মনীষার জীবন ও কর্ম রয়েছে সেমিনারের আয়োজন।
এ ছাড়া মেলা চলাকালে প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা এবং সঙ্গীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে।
এবারের মেলায় নতুন সংযোজন হিসেবে টিএসসি ও দোয়েল চত্বরের মূল প্রবেশ পথে এলইডি মনিটর স্থাপিত থাকবে। এখান থেকে মেলা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যাবে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘নতুন বইয়ের প্রদর্শনশালা’ করা হয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রকাশিত নতুন বই দিনভিত্তিক সাজানো থাকবে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে পর্যটন করপোরেশনের একটি ক্যান্টিন এবং বাংলা একাডেমি অংশে পর্যটন করপোরেশনের একটিসহ দু’টি ক্যান্টিন চালু থাকবে। শিশুকর্নারে এবার নতুন সংযোজন ‘মাতৃদুগ্ধ সেবাকেন্দ্র’ স্থাপনের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চে নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গ্রন্থমেলা ১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে।
এ দিকে মেলা উপলক্ষে স্টল প্রস্তুতের কাজ শেষ করেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। ভ্যানগাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে বই নিয়ে আসছেন স্টলের কাজ শেষ করা প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা। তবে কিছু কিছু স্টলের কাজ চলছে। মেলা উদ্বোধনের আগেই তাদের কাজ সমাপ্ত
ইসমাঈল/এমবি





