দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জেলা পরিষদ নির্বাচন। আগামী ডিসেম্বরে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এমনটিই ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তবে এই নির্বাচন হবে জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, পরিষদের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য প্রতিনিধি নির্বাচিত হবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে।
স্থানীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, সরকার পরিকল্পনা করছে ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্বাচকমণ্ডলীতে রেখে পূর্ণাঙ্গ জেলা পরিষদ গঠন করার। স্থানীয় সরকার বিভাগ এ লক্ষ্যে জেলা পরিষদ আইন-২০০০ পর্যালোচনার কাজ শুরু করেছে। শিগগির নির্বাচনের বিষয়ে আনুষ্ঠনিক ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেলা পরিষদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচন বিদ্যমান আইনেই হবে। এ জন্য যদি কোনো এসআরও জারির প্রয়োজন হয়, তা করা হবে। আর নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোনো আইন অসঙ্গতিপূর্ণ হলে সেটিতে সংশোধনী আনা হবে। আগামী বাজেট অধিবেশনের মধ্যেই নির্বাচনসংক্রান্ত আইনি কাজ সম্পন্ন করে ডিসেম্বরে নির্বাচনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’ জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জেলা পরিষদ প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা দেওয়া এ নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য বলে তিনি জানান।
জেলা পরিষদ আইন
এ নির্বাচন করার প্রস্তুতি চলছে জেলা পরিষদ আইন-২০০০ অনুযায়ী। বিদ্যমান এ আইনের ১৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, 'প্রত্যেক জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি করপোরেশনের (যদি থাকে) মেয়র, কমিশনার, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, কমিশনার এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হবে।'
১৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, 'প্রত্যেক ওয়ার্ডের জন্য নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত একটি ভোটার তালিকা থাকবে।' ১৭(৩) ধারায় বলা হয়েছে, 'নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য নন এমন কোন ব্যক্তি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না।' আইনের এ ধারা অনুযায়ী ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের ভোটদানের মাধ্যমে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনের পর একটি পূর্ণাঙ্গ পরিষদ গঠন করা হবে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে একজন চেয়ারম্যানের পাশাপাশি ১৫ জন সদস্য এবং সংরক্ষিত ৫ জন নারী সদস্যও নির্বাচন করা হবে।
অন্য এক সূত্র জানায়, সরকার ভোটার বাদে বাইরে থেকে কাউকে জেলা পরিষদ প্রশাসক নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিতে চাইলে বিদ্যমান আইনে কিছু জটিলতা রয়েছে। সেগুলো সংশোধন প্রয়োজন হবে। কারণ বিদ্যমান আইনে ভোটার বাদে কেউ এ পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই।
দলীয় না নির্দলীয় নির্বাচন
জেলা পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে কি-না সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন দলীয়ভাবে হলে সরকারদলীয় ব্যক্তিই জেলা পরিষদের প্রশাসক হওয়ার সুযোগ পাবেন। কারণ বর্তমানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বেশিরভাগই সরকারদলীয়।
সম্প্রতি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠানের জন্য সংশোধিত আইন অনুমোদন করা হয়। এ সময় জেলা পরিষদেও একই ব্যবস্থা চালুর জন্য আইন সংশোধন করা হয়। যদিও মন্ত্রিসভা তা অনুমোদন করেনি। গত ২৮ মার্চ মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে আইনটি সংশোধন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়। ওই বৈঠকে জেলা পরিষদ নির্বাচনের বিষয়েও ইতিবাচক মত দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পরই স্থানীয় সরকার বিভাগ এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
প্রশাসকদের মধ্যে ক্ষোভ
এদিকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও মর্যাদা না দেওয়ায় প্রশাসকদের মধ্যে শুরু থেকেই এক ধরনের ক্ষোভ রয়েছে। সে কারণে তাদের কাজকর্মেও নানা স্থবিরতা ও অনীহা রয়েছে। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত সপ্তাহে জেলা পরিষদ প্রশাসকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা সভায়। ওই সভায় একাধিক জেলা পরিষদ প্রশাসক অভিযোগ করেন, কোনো অনুষ্ঠানে গেলে ডিসিকে স্যার সম্বোধন করতে হয় তাদের।তা না করা হলে ডিসিরা অসন্তুষ্ট হন বলে জানান তারা। জেলা প্রশাসকদের মতে, ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুযায়ী জেলা পরিষদ প্রশাসকদের মর্যাদা নির্ধারণ করা উচিত। তাহলে এ সমস্যা থাকবে না। এ অবস্থায় জেলা পরিষদ কার্যকর করে তুলতে সরকার এ নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে।
উল্লেখ্য, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে জেলা পরিষদ গঠন করা হয়। ওই সময়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হতো। জেলা পরিষদের মাধ্যমে তখন মূলত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হতো। জেনারেল এরশাদের শাসনামলেও পরিষদ কার্যকর ছিল। ১৯৮৮ সালে ঠিক হয়, সরকার মনোনীত ব্যক্তিরা নন, সংসদ সদস্যরা হবেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। কিন্তু নব্বইয়ের পট পরিবর্তনের পর ফের জেলা পরিষদ অকার্যকর হয়ে পড়ে। ওই সময় উপজেলা পরিষদও বিলুপ্ত করা হয়। মূলত জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো নির্বাচন না দেওয়ায় জেলা পরিষদ অকার্যকর হয়ে পড়ে। সরকারের উপসচিব পদমর্যাদার একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিয়ে এ পরিষদের পরিচালনা শুরু হয়।
পরে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার জেলা পরিষদ আইন-২০০০-এর ৮২(১) ধারা অনুযায়ী দেশের তিনটি পার্বত্য জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। এ আইনানুসারে, জেলা পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত একজন প্রশাসক জেলা পরিষদের কার্যাবলি সম্পাদন করবেন। তবে জেলা পরিষদের নির্বাচন কবে হবে এবং প্রশাসক কতদিন দায়িত্ব পালন করবেন, তার কোনো সময়সীমার উল্লেখ ওই আইনে নেই। আইনানুযায়ী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর শুরু হয় নানা বিতর্ক। বিশেষজ্ঞরা এটিকে অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন।
এআই





