লেখক-প্রকাশক হত্যা, হামলা, হামলার হুমকির প্রতিবাদে এবং মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা ও খুনিদের বিচার দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের ডাকা আধাবেলা হরতাল শান্তিপূর্ণ ও ঢিলেঢালাভাবে শেষ হয়েছে।

সকাল থেকে রাজধানীর কয়েকটি পয়েন্ট ছাড়া কোথাও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের অবস্থান ছিল না। ফলে অন্যান্য দিনের মতো রাজধানীতে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। দূরপাল্লার বাস ছেড়ে গেছে ঢাকা থেকে তবে যাত্রীসংখ্যা ছিল অন্যান্য দিনের চাইতে খুবই কম।

তবে যে কয়টি পয়েন্টে বিশেষ করে শাহবাগ মোড়, পল্টন, মিরপুর ও সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হরতাল সমর্থকদের উপস্থিতির কারণে যান চলাচল করতে পারেনি। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা এসব পয়েন্টে রাস্তা দখল করে গান, স্লোগান, কবিতা পরিবেশন করে হরতালের পক্ষে মানুষের সমর্থন ও সহযোগিতা আদায়ের চেষ্টা করে।

শুধু রাজধানীতেই নয়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলো ছাড়াও বিভিন্ন জেলায়ও পালিত হয়েছে হরতালের কর্মসূচি।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই শাহবাগ প্রজন্মচত্বরে অবস্থান নেয় গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীরা। সকাল ৭টার দিকে প্রজন্মচত্বর থেকে একটি মিছিল বের হয়ে বাটা সিগন্যাল ঘুরে এসে শেষ হয় শাহবাগ মোড়েই। এর পর থেকেই শাহবাগ মোড়ের মূল সড়কেই অবস্থান নেন তারা। এরপর থেকে সেখানে সব ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শাহাবাগ ছাড়াও রাজধানীর পল্টন, মিরপুর ১০ নম্বর মোড়েও অবস্থান নেয় হরতাল সমর্থনকারীরা।

এদিকে হরতালে সমর্থনে রাজপথে অবস্থান নেয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্টী, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

চট্টগ্রাম: মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া গণজাগরণ মঞ্চের দেশব্যাপী অর্ধদিবস হরতালে পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। কোথাও কোনো পিকেটিং বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

কিছু কিছু দুরপাল্লার গাড়ি ছাড়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল কদমতলী, দক্ষিণাঞ্চলের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল ও উত্তরাঞ্চলের অক্সিজেন বাস টার্মিনাল থেকে সব রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ট্রেন চলাচলও স্বাভাবিক। তবে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কিছুটা কম ছিল রাস্তায়।

মঙ্গলবার সকালে সরজমিনে নগরীর নিউমার্কেট, দেওয়ানহাট, টাইগার পাশ, ওয়াসা মোড়, জিইসি মোড়, দুই নম্বর গেইট, মুরাদপুর, আন্দরকিল্লা, বহদ্দারহাট, অক্সিজেন এলাকা ঘুরে হরতালের সমর্থনে কোনো ধরনের পিকেটিং বা মিছিল দেখা যায়নি।

তবে সকাল ৭টার দিকে নগরীর কিছু পয়েন্টে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা পথসভা করেছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানার জন্য জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক শিমুল বৈষ্ণবের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

জেলা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আরিফ বাংলামেইলকে বলেন, ‘আজকের হরতাল গণজাগরণ মঞ্চের। এখানে রাজনৈতিক কোনো সংগঠনের সম্পৃক্ততা নেই। তাই এই বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না।’

তবে সোমবার সন্ধ্যায় আজকের হরতালের সমর্থনে নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে একটি মশাল মিছিল বের করেন গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা। মিছিলে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক, শিক্ষক, ছাত্রনেতা ও পেশাজীবীরা অংশ নেন। নগরীর আন্দরকিল্লা মোড় ও শহীদ মিনার হয়ে নিউ মার্কেট চত্বরে এসে মিছিলটি শেষ হয়।

সিলেট: হরতালের সমর্থনে সকাল থেকে নগরীতে কোনো কর্মীকে দেখা না গেলেও সকাল ১০টার দিকে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে হরতাল সমর্থকরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

হরতাল শুরুর পর নগরীর কোর্ট পয়েন্ট, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, চৌহাট্টাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নগরীতে রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ ছোট গাড়ি চলাচল করছে। তবে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।

এদিকে, হরতালে নাশকতা ঠেকাতে মাঠে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মঙ্গলবার ভোর থেকে সিলেট নগরীর প্রতিটি পয়েন্টে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। এ ছাড়া মাঠে সাদা পোশাকধারী পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ছিল বলে বাংলামেইলকে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার রহমত উল্লাহ।

খুলনা: খুলনায় হরতালে কোনো প্রভাব পড়েনি। গণজাগরণ মঞ্চের ডাকা আধাবেলা হরতালে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

সোনাডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাসটারমিনাল থেকে বিভিন্ন রুটে বাস ছেড়ে গেছে। এছাড়া ট্রাক, মাহেন্দ্রা, ইজিবাইক, প্রাইভেটকারসহ হালকা যান চলাচল করতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানপাট খুলতে শুরু হয়েছে।

গতকাল সোমবার হরতালের সমর্থনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠন মিছিল সমাবেশ করলেও সকালে খুলনার কোথাও মিছিল পিকেটিং এর সংবাদ পাওয়া যায়নি।

খুলনা গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র আব্দুল হানিফ বলেন, ‘খুলনায় কর্মসূচি পালনের পরিস্থিতি নেই।’
খুলনায় গণজাগরণ মঞ্চের ৫১ সদস্যের কমিটি থাকলেও দীর্ঘদিন দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি।

জাবি, সাভার: হরতালের সমর্থনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে জাবি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় গণজাগরণ মঞ্চের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী হরতালের শুরুতে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়বাংলা (প্রান্তিক) গেইটের সামনে অবস্থান নিলে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

ছাত্র ইউনিয়ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি তন্ময় ধর বলেন, ‘আমাদের পিঠ শুধু দেয়ালেই ঠেকেনি, আজ আমাদের পিঠে চাপাতিও ঠেকেছে। আমরা এ অবস্থার অবসান চাই। আমরা বাধ্য হয়েছি এই কর্মসূচি নিয়ে রাস্তা অবরোধ করতে। আমরা নিরাপত্তার দাবি নিয়ে এখানে এসেছি।’

বেলা ১২টা পর্যন্ত হরতালের পুরোটা সময় এই অবরোধ চলে। অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ থাকায় তিন কিলোমিটারের বেশি যানজট সৃষ্টি হয়েছে।

যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মহাসড়কে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

গত শনিবার জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা এবং শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশিদ টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করার প্রতিবাদে সারা দেশে আধাবেলা এই হরতাল করছে গণজাগরণ মঞ্চ। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এ হরতালে সংহতি জানায়।

এমএইচ