আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালো হচ্ছে, সবার আগে কমিশনকে এই আস্থা অর্জন করতে হবে। বৃহস্পতিবার নির্বাচনী সংলাপে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) এ পরামর্শ দেন।

একই সঙ্গে যথাযথ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি, সম্ভব হলে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একাধিকবার মতবিনিময় এবং বিতর্ক এড়িয়ে পরিস্থিতি বুঝে দরকার পড়লে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে ইসিকে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন সাংবাদিকরা।

আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে দ্বিতীয় দিনের সংলাপে ২৪ জন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি তাদের মতামত তুলে ধরেন। 

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে সকাল ১০টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত এই সংলাপ হয়। সেখানে চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংলাপে বাসস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ জানান, নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান, আইন ও বিধিবিধান মেনে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনি প্রয়োগ ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখলে সবার প্রশংসা পাবে কমিশন। 

সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় গৌরব’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় কমিশন মনে করলে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনাবাহিনীকে রাখতে পারবেন।’ 

ভয়েস অব আমেরিকা’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি আমীর খসরু বলেন, ‘পরিবারে মা-বাবার কেউ একজন না থাকলে যেকোনো একজনকেই দু’জনের ভূমিকা পালন করতে হয়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য এবার কমিশনকে এই ভূমিকা পালন করতে হবে।’ 

এনটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক খায়রুল আনোয়ার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে এখন থেকেই সফলতার সঙ্গে সাহস দেখাতে হবে। তফসিলের আগেই সাংবিধানিক দায়িত্ব প্রয়োগ করে সবার আস্থা অর্জন করত হবে। শুধু প্রধান বিরোধী দল নয়, সব দলের প্রতি সমান গুরুত্ব দিতে হবে।’

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের নির্বাহী সম্পাদক খালেদ মহিউদ্দীন বলেন, ‘কমিশন একটি ভালো নির্বাচন করবেন, তাদের প্রতি সবাই এই আস্থা কমিশনকেই অর্জনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ ই মামুন বলেন, ‘যে সরকারের অধীনেই নির্বাচন হোক না কেন, কমিশন সেই সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে নির্বাচন করতে পারলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।’ 

যমুনা টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ফাহিম আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনে না ভোটের বিধান রাখা ভালো। কারণ ভোটারদের কোনো প্রার্থী পছন্দ নাও হতে পারে।’ এছাড়া তিনি জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করলে ঢাকার আসন আরও বেড়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন। 

একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু বলেন, ‘ভোটে সেনাবাহিনীর প্রয়োজন নেই। সেনাবাহিনীর ব্যবহার রাজনৈতিক কারণে হলে তা থেকে বিরত থাকতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘সব দলকে ডেকে এনে আলোচনা, ঐক্যমত, সংলাপের দরকার নেই। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে আপনাদের। কে এলো, কে এলো না তা দেখার বিষয় ইসির নয়।’ 

দেশের ৪০ হাজার ভোট কেন্দ্রে ক্যামেরাসহ সাংবাদিকদের পাঠাতে সক্ষম টেলিভশনগুলো। কমিশনকে এগুলো ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। 

মাছরাঙা টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক রেজোয়ানুল হক রাজা বলেন, ‘ভোটে যারা আসবে, তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সব সময় সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে টানা-হেঁচড়া না করাই ভালো।’ 

ডিবিসি নিউজের সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রাজনীতি রয়েছে; এ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পোলিং এজেন্ট যেন দলীয় না হয়, সে বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে।’

নিউজ ২৪’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হাসনাইন খুরশিদ বলেন, ‘ইসির কাছে যে পর্যাপ্ত ক্ষমতা রয়েছে, তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দলগুলোর আস্থা চূড়ান্তভাবে অর্জন সম্ভব হবে না। তবে জনগণের আস্থা অর্জনে সব পদক্ষেপ নিতে হবে।’ 

প্রধান দুই দলের সঙ্গে ‘সিরিজ সংলাপে’র প্রস্তাব দেন বাংলাভিশনের হেড অব নিউজ মোস্তফা ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘প্রধান দুই দল সমঝোতায় না এলে ভোটের মাঠে সেনাবাহিনী বা এলিট ফোর্স দিয়ে কোনো লাভ হবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা হলে এসব বাহিনীরও দরকার পড়বে না। সমঝোতায় এলে দল দুটির কর্মীরাই পাহারা নিয়ে ভোট সুষ্ঠু করবে।’ ৩০০ আসনে একাধিক দিনে ভোট এবং ধর্মীয় দলগুলোর নিবন্ধন বাতিল করে গঠনতন্ত্র সংশোধন ও নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে ইসিকে আহ্বান জানান মোস্তফা ফিরোজ। 

দিপ্ত টিভির বার্তা সম্পাদক মাহমুদুল করীম চঞ্চল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে বোঝাতে হবে যে তাদের ওপর আস্থা রাখা যায়। এটা সব দলকে বিশ্বাস করাতে পারলেই নির্বাচন উৎসবমুখর হবে।’ 

সংলাপে আরও যেসব সুপারিশ এসেছে:
সংলাপ শেষে ইসির সম্মেলন কক্ষে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ সার্বিক বিষয়ে একীভূত মতামতগুলো তুলে ধরেন। 

সেনা মোতায়েন পক্ষ-বিপক্ষ মত রয়েছে; অধিকাংশ বক্তাই ইসির ওপর ন্যস্ত করেছেন; না ভোট নিয়ে দ্বিধাভিক্ত মত এসেছে; পর্যবেক্ষক নিয়োগে সতর্ক অবলম্বনের পরামর্শ; ভোট কেন্দ্রে এনআইডি লাগবে না- এটার প্রচারণা নিশ্চিত করা; ভোটে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধের সুপারিশ; টিভি চ্যানেল ও সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষক নিয়োগের সুপারিশ; প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দল নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ; ভোটের দায়িত্বে থাকা গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশিক্ষণ; প্রার্থীর হলফনামা এনবিআর-দুদকের মাধ্যমে যাছাই; ভোটার অনুপাতে আসন বণ্টন; স্বাধীনতা বিরোধীদের নিবন্ধন না দেওয়া ও নিবন্ধিতদের কার্যক্রম নিরীক্ষা; ভোটের ফলাফল দ্রুত ও সঠিকভাবে প্রচারের ব্যবস্থা; সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; পরাজিত প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; একাধিক দিনে ভোট আয়োজন; প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা; সংবাদ সংগ্রহে গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত; ঝূঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা এখনই প্রস্তুত রেখে ব্যবস্থা নেওয়া; অনূকূল পরিবেশ তৈরিতে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘন ঘন সংলাপ; সীমান পুনর্নির্ধারণ ও আইন সংস্কারে বড় ধরনের সংশোধন না করার সুপারিশ এসেছে। 

ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব জানান, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধির সংলাপ শেষে আগামী ২৪ অগাস্ট থেকে রাজনৈতিক দলের মতামত নেওয়া শুরু হবে। 

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব জানান, এ পর্যন্ত পাওয়া সুপারিশগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে তুলে ধরা হবে।
ঈদের আগে ২৪, ২৮ ও ৩০ আগাস্টের পর ঈদুল আজহা শেষে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ফের সংলাপ শুরু হবে বলেও জানান তিনি। 

ইসির সংলাপে যারা উপস্থিত ছিলেন:
আবুল কালাম আজাদ, খায়রুল আনোয়ার, জ ই মামুন, শাইখ সিরাজ, সৈয়দ আশিক রহমান, রাশেদ চৌধুরী, মোস্তফা ফিরোজ, তুষার আব্দুল্লাহ, খালেদ মহিউদ্দীন, রেজোয়ানুল হক রাজা, মোজাম্মেল বাবু, তালাত মামুন, সুকান্ত গুপ্ত অলক, ফাহিম আহমেদ, হাসনাইন খুরশিদ, মুস্তাফিজ রহমান, শরিফুল ইসলাম, মাহমুদুল করিম চঞ্চল, বিল্লাল হোসাইন বেলাল, সেলিম বাশার, আমির খসরু, সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, মুরসালীন নোমানী ও এস এম হারুন-উর রশীদ।

এমএনজে