পদ্মার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়ায় লঞ্চডুবির ঘটনায় নিহত ১৪ জনের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। এর মধ্যে ৩ পরিবারের ৯জন সদস্য রয়েছে।
এদের বাড়ি কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর ও সদর উপজেলায়। নিখোঁজ রয়েছে দুই শিশুসহ ৩জন। নিহত পরিবারে চলছে শোকের মাতম। নিহতদের মধ্যে বিয়ের পিঁড়িতে বসার আশায় কনে দেখে, কেউবা মানত শোধ করে, কেউবা সন্তানকে সাথে নিয়ে আর কেউবা ব্যবসায়িক কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু সে ফেরা আর হয়ে উঠেনি। বাড়ি ফিরেছেন লাশ হয়ে।
লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে পৌনে বারটার দিকে। আর মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছেছে দুপুর নাগাদ। এরপর থেকে স্বজনদের অপেক্ষা। মধ্যরাতে একে একে আসতে শুরু করে মরদেহ। স্বজনদের আহাজারি আর আর্তনাদে সে কথাই বারে বারে উঠে এসেছে।
কুষ্টিয়া ছেঁউড়িয়ার মোল্লাপাড়া গ্রামের মৃত সাবুর বড় ভাই লাবু জানান, সাবু গিয়েছিলেন বিয়ের পাত্রী পছন্দ করতে। পাত্রী পছন্দ হওয়ার পর বিয়ের দিনক্ষন ঠিক করে বাড়ি ফেরার পথে লঞ্চডুবিতে সাবু (৩০), তার মা মর্জিনা খাতুন (৫৬) এবং তার ভাই এর মেয়ে লাবনী (১৪)’র মৃত্যু হয়। আনন্দের বদলে এখন শোকের ছায় সাবুর বাড়িতে।
কুমারখালী উপজেলার সাঁওতা গ্রামের ফারুক জানান, তার স্ত্রী রেবেকা খাতুন (২৯) তার তিন বছরের ছেলে রাইসান ও মেয়ে বিথি খাতুনকে (১৪) নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকায় এক কবিরাজের বাড়িতে মানত শোধ করতে। মানত শোধ করে বাড়ি ফেরা হয়নি তাদের। একই পরিবারের তিন জনের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ পরিবারের স্বজনরা।
একই এলাকার প্রতিবেশী মোস্তফা বিশ্বাস (৬০) এখনও নিখোঁজ বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। লঞ্চডুবির সময় লঞ্চে থাকা কুমারখালীর উপজেলার খয়ের চারা গ্রামের মিলি খাতুন জানান, ঢাকা থেকে স্বামী সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। লঞ্চডুবিতে নিজে বেঁচে গেলেও চোখের সামনে মরতে দেখেছেন স্বামী হাফেজ ইউনুস আলী (৩০) ও তার মেয়ে আড়াই বছরের ফাতেমাকে। স্বামীর লাশ খুঁজে পেলেও মেয়েকে পাওয়া যায়নি। এখনও সে নিখোঁজ রয়েছে। স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে পাগল প্রায় সে।
পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া শহরের ভাঁটাপাড়া এলাকার নাসির (২৯) তার দুই মেয়েকে বাড়িতে রাখার জন্য ঢাকা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন। লঞ্চডুবিতে মৃত্যুর পর তার লাশ উদ্ধার হলেও নিখোঁজ তার সাথে থাকা তার বড় মেয়ে নাইমা (৬)। ছোট মেয়ে নোহাকে (৪) জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এ পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
ব্যবসায়িক কাজ শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল কুমারখালী শহরের কুন্ডুপাড়া এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী মধু সুধন শাহার (৬৫)। কিন্তু লঞ্চডুবিতে বাড়ি ফিরেছেন লাশ হয়ে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নির্বাক পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, খোকসা উপজেলার জয়ন্তিহাজরা ইউনিয়নের মহিষবাথান গ্রামের একই পরিবারের ৩ জন, ইসমাইল হোসেন এর মেয়ে লতা (২২), আড়াই বছরের ছেলে পুলক হোসাইন এবং ছোটভাই এনামুল (১৪) মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের লাশ মধ্য রাতে খোকসায় পৌঁছে।
এছাড়া কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নতুন কমলাপুর এলাকার সান্টু মিয়ার ছেলে প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বাপ্পী (৩২) এবং মিরপুর উপজেলার আমলা সদরপুর স্কুল পাড়ার স্কুল পাড়া এলাকার আনসার আলীর ছেলে আসাদুল হক (২৭) মৃত্যুবরণ করেন।
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, জেলার খোকসা উপজেলায় ৩জন, কুমারখালী উপজেলায় ৮জন, সদর উপজেলায় ২জন এবং মিরপুর উপজেলায় ১জন এর মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। স্বজনদের ভাষ্য অনুয়াযী নিখোঁজ রয়েছে ৩ জন।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহা আক্তার জানান, নিহতদের লাশ প্রশাসন তদারকির মাধ্যমে পৌঁছে দিচ্ছে পরিবারের কাছে।
কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, নিহতের লাশ দাফনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও পরিবারের জন্য খাস জমি দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি।
ইআর





