রাজধানীতে শনিবার রাতে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি। গতকাল রোববার সকাল থেকে একটানা দুপুর পর্যন্ত চলে অতি ভারী বৃষ্টি। এতে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা নগরীর অধিকাংশ এলাকা ডুবে থাকে। দুপুরের পর বৃষ্টি থামলে ধীরে ধীরে পানি নামতে থাকে। সন্ধ্যা পর্যন্তও অনেক নিচু এলাকায় পানি জমে থাকে। জলাবদ্ধতা আর গণপরিবহনের স্বল্পতায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সড়কে নষ্ট হওয়া গাড়ি ঠেলে বা রিকশায় চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে যাত্রীদের।
অতিবৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থার কারণেই রাজধানীতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান বাসিন্দারা। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও বলছেন, অতিবৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া এবং পানি নামানোর ওয়েআউটগুলো বন্ধ থাকায় কিছু কিছু এলাকায় পানি জমে মানুষের চলাচলে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব ধরনের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নগরীতে ১৭৫ মিলিমিটার (মিমি) বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। রোববার ভোর ছয়টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ১২ ঘণ্টায় ঢাকায় ৯৫ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, আর সকাল ছয়টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৮২ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সব মিলিয়ে ৩০ ঘণ্টায় ১৮০ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা চলতি মাসে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৯ সালের জুলাইয়ে একদিনে রাজধানীতে সর্বোচ্চ ৩৩৩ মিমি বৃষ্টি হয়েছিল।
টানা বৃষ্টিতে জাহাঙ্গীর গেট, মহাখালী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকা, গ্রিন রোড, তেজগাঁও, নাখালপাড়া, পান্থপথ, কলাবাগান, মগবাজার, মালিবাগ, মধুবাগ, রামপুরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, নিউ মার্কেট, আজিমপুর, মতিঝিল, পুরান ঢাকার পুরো এলাকা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রধান সড়ক এবং অলিগলিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। মতিঝিলে মেট্রো রেলস্টেশনের ফুটপাতেও পানি থৈ থৈ করছিল। ফলে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এবং অনেক স্থানে গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ ও কর্মজীবীরা। এতে প্রধান সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সমস্যার কারণে রাজধানীর বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান অর্ধবার্ষিক ও অন্যান্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বেইলি রোড শাখা), ওয়াইডব্লিউসিএ উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (গ্রিন রোড শাখা), বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, নালন্দা স্কুল (শংকর), নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ (খিলক্ষেত)।
ভারী বৃষ্টিতে সকাল থেকেই কর্মমুখী মানুষকে তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হয়। বাড়তি ভাড়ায় রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন না পেয়ে রাস্তায় আটকে থাকেন।
দুপুর সাড়ে ১২টায় কোমর পানিতে ভাসছিল বংশালের রাস্তা, দোকানপাট পানিতে থৈ থৈ করছিল। আজিম উদ্দিন নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, ৩০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করি। এত বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতা আর কখনো দেখিনি।
পুরান ঢাকার বেচারাম দেওরী এলাকার জামাল উদ্দিন বলেন, এত বৃষ্টি হয়েছে যে, এলাকার বাড়িঘর, দোকানপাটে পানি ঢুকে গিয়েছিল। পুরো এলাকাই যেন পানিতে থৈ থৈ করছিল। তিনি আরো বলেন, প্রতিবছর জলাবদ্ধতা হলেও এবারের অবস্থা খুবই নাজুক।
তেজগাঁও, ফার্মগেট ও নাখালপাড়ার চিত্র
ভারী বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় ফার্মগেট-নাখালপাড়া সংযোগ সড়কের অধিকাংশ এলাকা কার্যত ছোট-খাট খালে পরিণত হয়। রিকশা বা ভ্যান ছাড়া এই পথ পাড়ি দেওয়ার কোনো উপায় নেই। এ সুযোগে যাতায়াত ভাড়াও বেড়েছে তিন থেকে চারগুণ। জলাবদ্ধতায় তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া ও শাহীনবাগের নিচু এলাকার বাসা-বাড়ির নিচতলার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। ঘরের ভিতরে পানি ঢুকে যাওয়ায় আসবাবপত্র বাঁচাতে অনেকেই সেগুলো খাটের ওপর স্তূপ করে রাখেন। এসব এলাকায় মুদি দোকান, হোটেল ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।
সকালে স্থানীয় বাজারে সবজি, নিত্যপণ্য ও রান্না করা খাবার সংগ্রহেও ভোগান্তি হয়। নিম্নআয়ের বহু পরিবার পানি কমার অপেক্ষায় ঘরেই অবস্থান করেন। সবচেয়ে সমস্যা তৈরি করেছে খাবার পানির সংকট। ঢাকা ওয়াসার ভূগর্ভস্থ পানির পাম্পগুলো নোংরা পানিতে ডুবে যাওয়ায় বেশিরভাগ বাড়িতেই সাপ্লাইয়ের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় মোটর চালিয়ে পানি তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।
তেজকুনিপাড়ার সুমন আহাম্মদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই এই এলাকার বাসিন্দাদের একই নিয়তি বরণ করতে হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঠিক সংস্কার না হওয়া এবং আবর্জনায় নালাগুলো বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি নামতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। একদিকে জলাবদ্ধতার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের অভাবে তৈরি হয় মানবিক সংকট। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করা হলে এই দুর্ভোগ আরো দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা তার।
জলাবদ্ধতার কারণে ফার্মগেট, তেজগাঁও ও বিজয় সরণি সংযোগ সড়কে যানবাহনের গতি অনেক ধীর হয়ে যায়। অনেক বাস, সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি পানিতে বিকল হয়ে পড়ায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। অফিসগামী মানুষকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যেতে হয়েছে, আবার অনেক শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীকে মাঝপথ থেকেই ফিরে যেতে দেখা গেছে।
দুই সিটির প্রশাসক যা বললেন
এদিকে গতকাল গুলশান, বনানী, মহাখালী, সংসদ ভবন, শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়াসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। জানতে চাইলে ডিএনসিসি প্রশাসক আমার দেশকে বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় পানি জমে মানুষের চলাচলে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। ড্রেন, নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথগুলো সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। যেসব এলাকায় পানি জমে আছে, সেখানে দ্রুত পানি অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে। ওয়াটার পাম্পগুলো সচল রাখা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।
জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, পানি নামাতে হলে বুড়িগঙ্গা অথবা শীতলক্ষ্যায় নামাতে হবে। কিন্তু পানি নামানোর ওয়েআউটগুলো বন্ধ রয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজই (রোববার) জলাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করেছি। আজিমপুর, ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকার ওয়েআউটগুলো বন্ধ রয়েছে। সেগুলো আবার চালু করতে হবে। ওয়েআউটের জন্য প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আগামী দিনে এর সুফল পাওয়া যাবে।
তিনি আরো বলেন, আজকের যে জলাবদ্ধতা, সেজন্য পাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হয়তো দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে পানি কমে যাবে। টানা ভারী বর্ষণে সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোর থেকেই সিটি করপোরেশনের কর্মীরা মাঠে কাজ করছেন। জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করে নগরজীবন স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আজও ভারী বৃষ্টির আভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক জানান, মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে এ ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ বৃষ্টি আজ সোমবারও অব্যাহত থাকতে পারে। ঢাকার মধ্যভাগে বৃষ্টি কমে গেলেও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি আরো দুদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অফিস জানায়, দেশের ছয় বিভাগে আরো ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। আবহাওয়াবিদ খোন্দকার হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত পূর্বাভাসে বলা হয়, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গতকাল রোববার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, শনিবার সকাল ৬টা থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩০ ঘণ্টার ব্যবধানে ১৭৯ মিলিমিটার অবিরাম বৃষ্টি হয় রাজধানীতে। এর মধ্যে সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৯৭ মিলিমিটার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৮২ মিলিমিটার এবং ১২টার পর ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত সারা দেশের মধ্যে পটুয়াখালীতে সর্বোচ্চ ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ফরিদপুর ও মাদারীপুর এলাকায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেশি ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার ধারণক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পলি ও প্লাস্টিক বর্জ্যে নর্দমাগুলো বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বড় ধরনের জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চালানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
দায়িত্বের জটিলতায় স্থবির
ঢাকা ওয়াসা থেকে পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত করা হয় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। উদ্দেশ্য ছিল একক কর্তৃত্বের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করা। কিন্তু পাঁচ বছর পার হলেও সিটি করপোরেশনগুলোতে পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো স্বতন্ত্র বিভাগ বা আধুনিক পরিচালনা কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বর্তমানে রাজধানীতে ১০৩টি জলাবদ্ধতার ‘হটস্পট’ রয়েছে, যার মধ্যে ডিএসসিসি এলাকায় ৬৫টি এবং ডিএনসিসি এলাকায় ৩৮টি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ বা নিয়মিত পরিষ্কার করাই সমাধান নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত ‘ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান’, প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং সিটি করপোরেশনের কার্যকর জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি।
একদিকে খাল দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অন্যদিকে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সমন্বয়হীনতাÑসব মিলিয়ে ঢাকা এখন এক ‘দুষ্টচক্রের’ কবলে। নাগরিকরা বলছেন, প্রতি বছর প্রকল্পের নামে বরাদ্দ বাড়ে, বাড়ে ভোগান্তিও। নগরবিশেষজ্ঞদের মতে, খাল-জলাধার ও নদীকে বাঁচিয়ে এবং কৃত্রিম ড্রেনেজের সঙ্গে তাদের সংযোগ নিশ্চিত না করলে ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনোদিনই নিরসন হবে না।
হাজার কোটি টাকার প্রকল্পেও মুক্তি নেই
বর্ষা মৌসুম এলেই যেন উন্নয়নের সব দাবি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে-মুছে একাকার হয়ে যায় রাজধানী ঢাকার। মাত্র ঘণ্টাখানেকের মাঝারি কিংবা ভারী বৃষ্টিতেই অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার সামনেও সৃষ্টি হয় হাঁটু থেকে কোমরসমান জলাবদ্ধতা। নাগরিক ভোগান্তির এ চক্র থেকে বাঁচতে গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও মেলেনি কোনো স্থায়ী সুফল। উল্টো নতুন নতুন প্রকল্পের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়েছে ঢাকার বাসিন্দারা।
এ জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ এক হাজার ২০২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭১৯ কোটি টাকায়। প্রকল্পের মেয়াদ তিনদফা বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে অনেক ড্রেনেজ অবকাঠামোই অকার্যকর। একই চিত্র ডিএনডি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও। সেখানে প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচের পরও জুরাইনসহ বেশকিছু এলাকায় আগের চেয়ে জলাবদ্ধতা বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূলে রয়েছে নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা। ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খানের মতে, ঢাকার অনেক এলাকায় ড্রেন থাকলেও সেগুলোর সঙ্গে খাল বা নালার কার্যকর সংযোগ নেই। এছাড়া বক্স কালভার্টগুলো বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিকল্পনাহীন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের কারণেই কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের সুফল মিলছে না।
গবেষকদের মতে, গত আট দশকে ঢাকা প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল হারিয়েছে। যে খালগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি নদীতে যাওয়ার কথা ছিল, তার বড় একটি অংশ এখন দখল, ভরাট কিংবা বক্স কালভার্টে রূপান্তরিত। এ বক্স কালভার্টগুলো এখন পানি নিষ্কাশনের পরিবর্তে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
এমএম