একই দিনে সরকারের একাধিক মন্ত্রী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষার্থীরা এসব আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার ও কোটাব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বানের দাবি জানান। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।
১৩ জুলাই ২০২৪ সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শেষে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করেন। এছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের বৈঠকের পর সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা আগে বলেছিলেন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তাহলে পরে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দেওয়া হলো কেন, তার জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বলেন, মামলা-হামলা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করা যাবে না। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্য ও সরকার-সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
শিক্ষার্থীরা জানান, ১৪ জুলাই সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পদযাত্রা শুরু হবে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে রাষ্ট্রপতির বরাবর স্মারকলিপি দেবেন। স্মারকলিপিতে সরকারি চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা বহাল রেখে বাকি কোটা বাতিলের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং ছাত্র ধর্মঘট অব্যাহত রাখারও ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রনেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকারি চাকরির সব গ্রেডে ৫ শতাংশ কোটা যৌক্তিক। এই কোটার আওতায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের জন্য কোটা বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার আদালতের আড়ালে থেকে সংকট দীর্ঘায়িত করছে। জরুরি অধিবেশন ডেকে সংসদেই বিষয়টির সমাধান করা উচিত।
আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নারী পুলিশ দিয়ে হামলা চালানোর অভিযোগও করেন তিনি। পাশাপাশি কুমিল্লায় গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে, ১১ জুলাই কুমিল্লায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিবর্ষণ ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগের পরদিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতারা। প্রতিনিধি দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের প্রতিনিধিরা ছিলেন। তারা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন।
আন্দোলনের আরেক নেতা সারজিস আলম বলেন, ১ জুলাই থেকে আন্দোলন চললেও সরকার বা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, দমন-পীড়নের পথ বেছে নিলে তার দায় সরকারকেই নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে বলে থামানোর হুমকি
সরকারের পক্ষ থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের (বর্তমানে পলাতক) বলেন, আপিল বিভাগের রায় না আসা পর্যন্ত কোটা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হবে না। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মহল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছে।
তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান (বর্তমানে পলাতক) আন্দোলন স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের কিছু সময় অপেক্ষা করা উচিত, কারণ বিশ্বের অনেক দেশেই কোটা ব্যবস্থা রয়েছে।
তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ অভিযোগ করেন, বিএনপি আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না ফিরলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনীয় কোটা সংরক্ষণ এবং অযৌক্তিক কোটাগুলো যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার বিষয়ে সরকার কাজ করছে।
গোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। আন্দোলন প্রতিহত করতে দলীয় নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের আবেগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি যেহেতু সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন, তাই সরকারের পক্ষে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ শাহবাগের মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কেউ যদি মনে করে, আদালত মানবে না, পুলিশের কথা মানবে না; তাহলে আমাদের করার কি আছে? আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে কিনা, ঘটনাটি অন্যদিকে ধাবিত করার চেষ্টা চলছে কিনা– এসব নিয়ে ডিবির টিম ও পুলিশ কাজ করছে।
ছাত্রলীগের হুঁশিয়ারি
কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হয়েছে মন্তব্য করে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমরা প্রত্যাশা করছি– অবিলম্বে ক্লাস-পরীক্ষা চালু হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে ফিরেছেন। তারাও ক্লাস-পরীক্ষা অব্যাহত রাখবেন। স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত করতে চাইলে আমাদের সুস্পষ্ট হুঁশিয়ারি থাকবে।
অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালসহ সাত দফা দাবিতে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে।
এমএম