পহেলা বৈশাখ, বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত একটি উৎসবের দিন। সরকারি কর্মচারীদের জন্য এ দিনটি উপলক্ষে বিশেষ ভাতা ব্যবস্থাও ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। বছরের প্রথম দিন হিসেবে দিবসটিকে স্মরণীয় করে রাখতে একেকজন একেক ধরনের আয়োজন করে থাকেন। বিভিন্ন সংগঠন আয়োজন করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বাসায় বাসায় তৈরি হয় মুখরোচক খাবার। নতুন জামা কাপড় পরিধান করে অনেকে বের হন, আনন্দ উৎসবই এ দিনের প্রধান কর্মসূচি থাকে কারো কারো । এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়। কেউ কেউ এটাকে বাড়তি আয়ের দিন হিসেবে ধরে থাকেন। আবার কেউ দিবসটিকে সনাতন ধর্মীদের একটি উৎসব হিসেবেও মনে করেন।
রিক্সা শ্রমিকদের অনেকে ভাবেন এসকল উৎসব শুধুমাত্র অর্থবিত্তের মালিকদের জন্য, সাধারণ মানুষদের জন্য নয়। বিশেষ করে তারা এ দিনে বাড়তি আয়ের আশায় বুক বাঁধেন। ভাবেন সবাই উৎসব করবে এ ফাঁকে যদি দু’চার পয়সা বেশি আয় করা যায় তাহলে স্ত্রী সন্তানাদি, বাবা –মাকে নিয়ে দুদিন ভালোভাবে চলতে পারবেন।
কেউ কেউ ভাবেন এটি একটি ধর্মীয় উৎসব, এর পালন শুরু করে সনাতন ধর্মীরা সুতরাং এ উৎসবের সঙ্গে মুসলমানদের কোন সম্পর্ক নেই। কেউ যদি পালন করেও তা না বুঝে করছে বলে মন্তব্য তাদের। এরকম একজন আমির হোসেন। রাজধানীর রামপুরা থানার অধিনস্থ মেরাদিয়ায় থাকেন। গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সদর থানায়। স্ত্রী ও চার ছেলে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ছেলেরা সবাই পড়াশুনা করেন। তার উপার্জনেই চলে পরিবার। রাজধানীর পল্টন মোড়ে কথা হয় তার সাথে। পহেলা বৈশাখ নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বলেন, ভাই আমরা মুসলমান আমাদের ধর্মে উৎসব দুটি। একটি রমজানের ঈদ অন্যটি কোরবানের ঈদ। এর বাইরে কোন উৎসব নেই। এ রকম আরেক জনের সঙ্গে কথা হয়। তার নাম রুহুল আমিন বাড়ি বাগেরহাটে, থাকেন মুগদাপাড়ায় । বৈশাখ নিয়ে তিনিও অনুরুপ কথা বলেন।
এ দিনে অনেকে পান্তা ইলিশ খায়, কখনও খেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের পান্তা ইলিশ নিয়ে বিশেষ দিন আয়োজন করার কোন কারণ নেই । এ দেশে আমরা প্রায় পুরো বছর জুড়েই ইলিশ পাই, যারা বছরে এক বার আথবা দুইবারের বেশি ইলিশ খেতে পারেন না, তারাই বিশেষ দিবসকে সামনে রেখে খেতে চায় বলে তিনি মনে করেন।
একটা বিষয় লক্ষনিয় ছিল, রিক্সা শ্রমিকদের যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে এদের সত্তর শতাংশ মনে করেন, বৈশাখি উৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব, এটি মুসলমানদের কোন উৎসব নয়।
আবার কেউ আছেন যারা অভাবের কারণে এ উৎসব পালন করতে পারেন না বলে জানান। এ রকম একজন কামাল হোসেন, বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুরে, এক ছেলে এক মেয়ে তার। তিনি বলেন, একদিন রিক্সা চালাতে না পারলে অথবা কোন কারণে অসুস্থ হয়ে গেলে পরদিন আর সংসার চলে না। আমরা কিভাবে বৈশাখ পালন করবো? সরকারতো চাকরিজীবীদের ভাতা দেয়, আমাদের কে ভাতা দিবে? কয়েকজন শ্রমিকই এরকম মন্তব্য করেন।
আবার কেউ আছেন বৈশাখ আসলে কী? সেটাই জানেন না। এরকম একজন সাগর, বাড়ি বরিশালের গৌরনদীতে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে বড় । প্রাইমারীতে পড়া অবস্থায় তার বাবা মারা যান। এরপর পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁদেই পড়ে। বয়স মোটামোটি হলেও এখনও বিয়ে করেননি। মা এবং দুই ভাই-বোনের দেখাশোনা করতে রিক্সা চালান তিনি। থাকেন শাজাহানপুরে। প্রতিদিনের মতো আজও বের হয়েছেন রিক্সা নিয়ে। দিন শেষে ১০০ টাকা ভাড়া পরিষদ করেন। নিজের থাকা খাওয়া বাদ দিয়ে মাসে যে টাকা উদ্ধৃত্ত থাকে তা বাড়িতে মায়ের কাছে পাঠান। সে শুনেছে বৈশাখ মানুষ পালন করে, কিন্তু সেটা কি কেন? তা কখনো জানার চেষ্টাও করেনি। সাগর মনে করে এসব নিয়ে ভেবে তার কোন লাভ নেই। যারা অর্থবিত্তের মালিক তারা এসব নিয়ে ভাববে, আনন্দ উৎসব করবে। তার মতে, খেটে খাওয়াদের প্রতিদিন ভাতের প্লেট সামনে নিয়ে বসতে পারাটাই আনন্দের।





