সিলেট ছাত্রলীগের হামলা ও চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ সাধারণ জনগণ। রেহাই পাচ্ছে না সংবাদকর্মীরাও। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি হামলার কারণে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সংবাদকর্মীরা। সিলেট ছাত্রলীগ মানে সংবাদকর্মী ও ব্যবসায়ীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম।

প্রত্যেকটি হামলার পর সিনিয়র নেতারা দোষীদের বিচার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ দেয়ার কোন নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি। নেতাদের কথা কথাই থেকেছে। যে কারণে দ্বিগুণ উৎসাহে দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ফুটপাতের হকার থেকে শুরু করে শপিং মলের মালিকরা।

স্থানীয় সাংবাদিকরা মনে করছেন কোন ঘটনারেই বিচার না হওয়া ছাত্রলীগের ক্যাডারদের অপরাধ প্রবণ করে তুলছে। তুচ্ছ ঘটনাতেই প্রকাশ্য অস্ত্র উচিয়ে নেমে পড়ছে রাস্তায়। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের উপর হামলার কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। না-জানি আগামীকাল কে ছাত্রলীগের নিশানায় পরিণত হয়।

গত দুই বছরে ১৬ জন সাংবাদিক ছাত্রলীগের হামলা শিকার হয়েছেন। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সাংবাদিকদের ৪টি মোটরবাইক। এ ছাড়া ক্যামেরা ভাংচুর ও ছিনিয়ে নেয়া নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সিলেট এমসি কলেজে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সশস্ত্র মহড়ার দৃশ্য ধারণ করার সময় হামলার শিকার হন সময় টিভির রিপোর্টার আব্দুল আহাদ ও ক্যামেরাপার্সন নওশাদ আহমেদ জুয়েল।

নওশাদ আহমেদ জুয়েল জানান, ওই ঘটনার কোন বিচার পাননি তারা। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ ঘটনার পর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু কথা কথাই থেকেছে।

২০১৩ সালে নগরীর আল-হামরা শপিং সেন্টারে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। হামলার সময় ব্যাপক লুটতরাজের খবর পেয়ে ভিডিওধারণ করতে যায় স্থানীয় সাংবাদিকরা। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ক্যাডাররা। ছাত্রলীগ ক্যাডার পিযুষের নেতৃত্বে সময় টিভির সিনিয়র রিপোর্টার একরামুল কবির ও ক্যামেরাপার্সন দীগেন সিংয়ের উপর হামলা চালানো হয়। এতে মারাত্মক আহত হন ওই দুই সাংবাদিক।

ওই ঘটনার পর স্থানীয় সাংবাদিকরা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ করে। তখন মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ দোষীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগের ওই ঘটনায় কামরান বলেছিলেন নির্বাচনের পরে ক্ষতিপূরণ দিবেন। কিন্তু আগের মতো এবারো কিছুদিন পর সব ভুলে গেছে কামরান ও অন্যান্যরা।

গত ২১ ফেব্রুয়ারি নগরীর সুরমা টাওয়ারের সামনে ছাত্রলীগের হামলা ও লুটপাটের ছবি তুলতে গেলে চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টার সাদিকুর রহমান সাকি, দৈনিক শ্যামল সিলেট’র রিপোর্টার আবু বকর ও তৎকালীন বাংলাভিশনের ক্যামেরাপার্সন জয়নাল আবেদিন আজাদের মোটরবাইক জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

এ সময় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের অনুনয় করেও নিজেদের বাইক রক্ষা করতে পারেনি সাংবাদিকরা।

ওই ঘটনার পরও আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত এক পয়সা ক্ষতিপূরণ বা দোষীদের শাস্তি হয়নি। বরং ক্ষেত্র বিশেষে ক্যাডারদের পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত জয়নাল আবেদিন আজাদ।

ঈদের দু’দিন আগে রিকাবীবাজার এলাকায় রাস্তায় উপর অবৈধ হাট বসায় ছাত্রলীগ। এ কারণে নগরীতে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। সাংবাদিকরা সরেজমিন রিপোর্ট করে বিষয়টি তুলে ধরেন। পরে পুলিশ এসে অবৈধ হাটটি তুলে দিলে ক্ষোভ গিয়ে পড়ে সাংবাদিককের উপর।

ওই দিন ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আরটিভির রিপোর্টার কামকামু রাজ্জাক রুনুকে পিটিয়ে আহত করে। এ সময় আরটিভির ক্যামেরা ভাংচুর করা হয়। এই ঘটনাতেও ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের কোনই বিচার হয়নি।

উপজেলা নির্বাচনের দিনে জালালপুর সরকারি প্রাথমিক কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতির ছবি তুলতে গেলে দৈনিক প্রভাব বেলার সম্পাদক কবির আহমেদ সোহেল ও দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকার ফটোগ্রাফার জয়নাল আবেদিন আজাদের উপর হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া একই দিকে কানাইঘাটে নির্বাচনী রিপোর্টিংয়ে গেলে মোহনা টিভির ক্যামেরাপার্সন ফেরদৌস আহমেদ’র উপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা।

সর্বশেষ হামলার ঘটনা ঘটলো বাংলানিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট আব্দুল্লাহ আল নোমানের ওপর। এমসি কলেজ ছাত্রলীগের নানা কুকীর্তির কাহিনী ধারাবাহিকভাবে বাংলানিউজে প্রকাশ হওয়ার জেরেই তার ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা।

সিলেট ছাত্রলীগের বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হচ্ছে সিলেট সিটি করপোরেশন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা রনজিত সরকারের মদদপুষ্ট গ্রুপটি। এই গ্রুপের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি সদস্য হিরণ মাহমুদ নিপু।

নিপু এক সময় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। তার নেতৃত্বে সিপিবির সমাবেশে বিনা উস্কানিতে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। তখন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিপুকে বহিষ্কার করা হয়। এর কিছুদিন পরেই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। তার দক্ষিণহস্ত হিসেবে পরিচিত জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রায়হান চৌধুরীও দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন।

পুরো নগরী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই গ্রুপের ক্যাডাররা। এদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে নিজ দলের লোকজনও। নিপু গ্রুপের নেতৃত্বেই এমসি কলেজের হোস্টেলে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়। হেন কাজ নেই তারা করছে না। ফুটপাতে চাঁদাবাজি থেকে বড় বড় শপিং মলও বাদ যাচ্ছে না। ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচির নামে চিঠি দিয়ে মোটা অংকের চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সূত্র: বাংলানিউজ

জেএ