বহুল আলোচিত রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব কেন্দ্রের ফলাফল পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত ফলাফলে এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমানের কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে ধরাশায়ী হলেন তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু।

এই প্রথম দলীয় প্রতীকের ভোটে সদ্য বিদায়ী মেয়র ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী।

প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে জয় ঘরে তুলেন জাতীয় পার্টির এ প্রার্থী। রাত সোয়া ১২টার দিকে রিটার্নিং অফিসার সুভাষ চন্দ্র সরকার মোস্তফাকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেন।

১৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৯৩টি কেন্দ্রের ফলই ঘোষণা করা হয়েছে। এতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা পেয়েছেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯ ভোট।

অপরদিকে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রংপুর সিটি কর্পোরেশনের (রসিক) সাবেক মেয়র সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু পেয়েছেন ৬২ হাজার ৪০০ ভোট।

এদিকে, বিএনপির প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা ৩৫ হাজার ১৩৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা হাতপাখা মার্কায় ২৪ হাজার ৬ ভোট পেয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছেন।

এছাড়া, আবদুল কুদ্দুস মই মার্কায় পেয়েছেন ১ হাজার ২৬২ ভোট। নির্বাচনে মোট সাতজন মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা মনে করেন, কেবল রংপুরেই নয়, সারা দেশেই লাঙ্গলের জোয়ার বইছে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জয়ের এই ধারা শুরু হল রংপুর দিয়েই।

তারা বলছেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দেশবাসী এমনিভাবে লাঙ্গলের বিজয় দেখতে পাবে।

এর আগে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ শেষে শুরু হয় ভোট গণনা। নির্বাচন বিশ্লেষকদের প্রাথমিক ধারণা, প্রায় ৭০ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

নগরীতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন। প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ভোটার ভোট দিয়েছেন। সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণ ও বাধাহীনভাবে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। বিকালে ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া মোস্তাফিজার রহমানের জয়ের খবর আসতে থাকে।

শহরজুড়ে শুরু হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিজয় মিছিল। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কয়েকদিন ধরেই রংপুর নগরীতে তার নিজ বাসভবন ’পল্লী নিবাস'-এ অবস্থান করছেন। রংপুরকে বলা হয় এরশাদের ঘাঁটি।

রংপুরে এরশাদের এ অবস্থানই মোস্তাফিজার রহমানের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। তবে নির্বাচনী আচরণবিধির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি তার বাসভবন থেকে বের হননি। অবশ্য সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, 'জয় হবে লাঙ্গলেরই।' শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ব্যাপারেও তিনি আস্থাশীল ছিলেন।

সর্বত্রই মেলার আমেজ

সুষ্ঠু ভোট হওয়ায় খুশি রংপুরের মানুষ। সন্তুষ্ট নির্বাচন কমিশনও। দিনভর ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সর্বত্রই দেখা যায় মেলার আমেজ।

ভোটাররা বাধাহীনভাবে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে লাইন ধরে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। নজিরবিহীন নিরাপত্তায় প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকের এই ভোটে সকালের দিকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ছিল ভোটারদের উপচে পড়া ভিড়। রংপুরের ইতিহাসে এটা ছিল সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। দুপুরে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বিকালে ভোট কেন্দ্রগুলোতে ছিল লম্বা লাইন। বিশেষ করে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কোথাও কোনোরকম কারচুপি বা জালিয়াতির খবর পাওয়া যায়নি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা বলেছেন, 'কোনোরকম বিচু্যতি নেই, কোনোরকম অভিযোগও নেই।'

নির্বাচনে মেয়র পদে ৭ জন, ৩৩টি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ২১১ জন এবং ১১টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু এবং ধানের শীষ নিয়ে বিএনপির কাওছার জামান বাবলা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে একটি কেন্দ্রে ডিজিটাল ভোটিং মেশিনে (ডিভিএম) ভোট নেয়া হয়েছে। সামনের নির্বাচনগুলোতে ডিভিএম ব্যবহার বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ছাইদুল ইসলাম।

এদিন নির্বাচন ঘিরে রংপুরজুড়ে ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ইসির নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশের কড়াকড়িতে নগরীতে যানি্ত্রক যান চলাচল ছিল প্রায় বন্ধ। এতে গাড়ি সংকটে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। এই সুযোগে পরিবহন শ্রমিকদের যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে দেখা যায়। তবে নির্বাচন উপলক্ষে নগরীর সব ধরনের বিপণিবিতান, মার্কেট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ।

সহিংসতায় আহত

রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচন মোটা দাগে শান্তিপূর্ণ হলেও ভোট গ্রহণ শেষে বিকাল সাড়ে চারটায় সিটির ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মডার্ন পাবলিক স্কুল কেন্দ্রে সহিংসতা হয়েছে। দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে শাহীন নামে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

তিনি এলাকার আবদুস সাত্তারের ছেলে। তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা যায়, বিকাল চারটার দিকে ভোট গ্রহণ শেষে কাউন্সিলর প্রার্থী শাফিউল আলম শাফির (লাটিম) সমর্থক ভোট কেন্দ্রের ভেতরে যাওয়ার চষ্টো করে। এ সময় দুই কাউন্সিলর প্রার্থী শাহ আলম ও জাকারিয়া আলম শিবলুর সমর্থকরা তাকে বাধা দেয়। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে শাহীনকে মারধর করে তারা। পরে পুলিশ ও বিজিবি লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

নিজের কেন্দ্রেই ঝন্টুর হার

নিজের কেন্দ্রেই ভোটে হেরেছেন রংপুর সিটি কর্পোরেশনের বিদায়ী মেয়র ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু। ওই কেন্দ্রে তার চেয়ে ১২৫ ভোট বেশি পেয়েছেন জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা।

বৃহস্পতিবার দিনভর ভোট গ্রহণের পর সন্ধ্যায় রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালেমা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করেন। সেখানে ঝন্টু নেৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৩৯৪ ভোট। লাঙ্গল প্রতীকে মোস্তফা পেয়েছেন ৫১৯ ভোট।

কেবি