চট্টগ্রাম মহানগরী এবং জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রায় অর্ধ শতাধিক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঠিকাদারী ব্যবসার নামে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে এক ঠিকাদার উধাও হয়ে গেছে।

উধাও হয়ে যাওয়া ওই  প্রতারক ঠিকাদারের নাম অশোক বড়ূয়া (৪৮)। তার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম পূর্ণিমা এন্টারপ্রাইজ। শুধুমাত্র চেক প্রতারণার দায়ে এই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১৩টি। গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে ১০টি মামলায়।

গত দুই মাস ধরে পুরো পরিবার নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া এই ব্যবসায়ীর কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। পুলিশও কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না তার।

সব হারানো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের বড়ূয়া পাড়া এলাকার জনৈক মৃত রঘুনাথ বড়ূয়ার ছেলে অশোক বড়ূয়া। তিনি বেশ কয়েকবছর মধ্যপ্রাচ্যে থাকার পর পাঁচ বছর পূর্বে মাত্র ১০ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন।

পূর্ণিমা এন্টারাপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি ঠিকাদারী লাইসেন্স নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে একের পরে এক সরকারি ঠিকাদারী কাজ সংগ্রহ করেন। নিজ প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ পাওয়ার পর তার অর্থসঙ্কট দেখিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরী ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের নিকট  দ্বারস্থ হয়ে ঠিকাদারী কাজ সম্পন্ন করার জন্য বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। দ

রপত্র অনুযায়ী কাজ শেষ করে লাভের ৭০ ভাগ বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীদের দেওয়া হবে বলে ফাঁদ পাতেন। এতে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী ঠিকাদার অশোক বড়ূয়ার এই ফাঁদে পা রাখেন।

শামসুল আলম নামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার এক ব্যবসায়ী জানান, অশোক বড়ূয়া এক কোটি টাকার একটি সেতু নির্মাণের ঠিকাদারী লাভ করার পর ওই দরপত্রের ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সংগ্রহ করেন।

এভাবে বিভিন্ন দরপত্রের ওয়ার্ক অর্ডার দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের চেক দিয়ে বিশ্বস্ততা অর্জন করে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করেন অশোক বড়ূয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অশোক বড়ূয়া চট্টগ্রাম মহানগরীর চাঁন্দগাঁও আবাসিক এলাকার এ ব্লকের দুই নম্বর সড়কের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। ঠিকাদারী ব্যবসার লোভ দেখিয়ে এই ব্যক্তি বাড়ির মালিকের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা এবং প্রতিবেশী এক ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে ৪২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন।

একইভাবে রাঙ্গুনিয়ার ইংল্যান্ড প্রবাসী এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা, রাঙ্গুনিয়ার স্থানীয় প্রভাবশালী আটজন রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে ১০ কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করেন।

এ ছাড়া এই প্রতারক ঠিকাদার রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়নের জনৈক সালাউদ্দিনের কাছ থেকে ৫২ লাখ টাকা, হাবিবুল্লাহ চৌধুরীর কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা, দৌলত হোসেন চৌধুরীর নিকট থেকে ৭০ লাখ টাকা, চট্টগ্রামের একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট থেকে চার কোটি টাকা, বাবুল নামের ইতালি প্রবাসী এক ব্যক্তির নিকট থেকে দুই কোটি টাকা, বাঁশখালী উপজেলার আলী আহাম্মদের নিকট থেকে ৭০ লাখ টাকা, নগরীর বহদ্দার হাট হক মার্কেটের এক ব্যবসায়ীর নিকট থেকে ৫২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন।

অশোক বড়ূয়ার সঙ্গে তার বোন জামাই আইসিবি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ-এর কর্মচারী বিল্পব বড়ূয়া এবং ভাতিজা অপু বড়ূয়া সিন্ডিকেট করেই এই প্রতারণার চক্র গড়ে তুলেন বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন।

এই ভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের নিকট থেকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে গত প্রায় তিন মাস ধরে উধাও হয়ে গেছেন অশোক বড়ূয়া।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ এলাকার অশোক বড়ূয়ার মালিকানাধীন পূর্ণিমা এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদারী কার্যালয়টি বন্ধ রয়েছে তিনমাস ধরে। একইভাবে তালাবদ্ধ রয়েছে চাঁন্দগাঁও আবাসিক এলাকার ভাড়া বাসাটিও।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অশোক বড়ূয়া তার স্ত্রী, দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে এই বাড়িতে বসবাস করতেন। তিন মাস পূর্বে দাওয়াত খেতে যাওয়ার নাম করে সে বাসার সব মালপত্র বাসাতে রেখেই পুরো পরিবার নিয়ে পালিয়ে যায়।

ব্যবসায়ীদের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাত করে অশোক বড়ূয়া ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। তারা এ ব্যাপারে পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

চট্টগ্রাম আদালত ও পুলিশের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে অশোক বড়ূয়ার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র চেক প্রতারণার দায়ে মামলা হয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে ১০টি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।

এসব মামলা ছাড়াও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানা, নগরীর পাঁচলাইশ থানা, চাঁন্দগাঁও থানায় অশোক বড়ূয়ার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়েছে।

রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবীর জানান, অশোক বড়ূয়ার বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে প্রতারণার একাধিক অভিযোগ থানায় জমা পড়েছে।

এছাড়া চেক প্রতারণার দায়ে তার বিরুদ্ধে আদালত থেকে জারি হওয়া একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানাও রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এমআর