রাজশাহীতে সদ্য বিবাহিত এক বাকপ্রতিবন্ধী যুবককে প্রলোভন দেখিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ (বন্ধ্যাকরণ) করানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তাঁর মা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। আপস-মীমাংসার নামে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ারও উঠেছে অভিযোগ।
দরিদ্র যুবকটি (২২) রাজশাহী নগরের একটি বস্তিতে থাকেন। বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির (এফপিএবি) রাজশাহী কার্যালয়ে ১৪ অক্টোবর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁকে স্থায়ীভাবে বন্ধ্যা করা হয়। অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের নাম খাজা ফেরদৌস। দুদিন পর যুবকের মা বিষয়টি জানতে পেরে নগরের বোয়ালিয়া থানায় লিখিত অভিযোগটি দাখিল করেন।
ওই অভিযোগে বলা হয়, নওগাঁর মান্দা উপজেলার খোকন ওরফে পরশ ও রাজশাহীর নওদাপাড়ার সাদিকুল যুবকটিকে অর্থের লোভ দেখিয়ে সমিতিতে নিয়ে গিয়ে বন্ধ্যা করান। মাত্র কয় দিন আগেই বিয়ে করেন তিনি। এ ঘটনায় সমিতির কার্যালয়ে গেলে যুবকের মাকে গালাগালি করেন চিকিৎসক।
নিয়মানুযায়ী অস্ত্রোপচারের আগে পদ্ধতি গ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করতে হয়, তিনি বিবাহিত কি না, অন্তত দুটি সন্তান আছে কি না, সব টিকা দেওয়া আছে কি না ইত্যাদি। এ ব্যাপারে অস্ত্রোপচারকারী খাজা ফেরদৌসকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, পদ্ধতি গ্রহণকারীর সই করা ফরম দেখেই তিনি অস্ত্রোপচার করেছেন।
খাজা ফেরদৌস জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা।
পরিবার জানায়, ওই ঘটনায় ১৬ অক্টোবর থানায় আপস-মীমাংসা করা হয়। এতে প্রথম পক্ষ হিসেবে পদ্ধতি গ্রহণকারী যুবকের মা ও দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে সমিতির জেলা কর্মকর্তা আশাদুল হককে দেখানো হয়েছে। আর আপসনামায় লেখা হয়েছে, আবার অস্ত্রোপচার করে যুবকটির সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ অবস্থায় মায়ের লিখিত অভিযোগকে আর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেনি পুলিশ।
যুবকের মা বলেন, তিন মাস পরে অস্ত্রোপচার করে তাঁর ছেলের সক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলা হলেও এ নিয়ে এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।
সমিতি সূত্রে জানা গেছে, যে ব্যক্তিকে বন্ধ্যা করা হয় তাঁকে দাপ্তরিক ভাষায় বলে ‘পদ্ধতি গ্রহণকারী’ ও যাঁর মাধ্যমে তিনি সমিতিতে আসেন তাঁকে বলা হয় ‘প্রেরণকারী’। স্থানীয়ভাবে এঁরা দালাল নামে পরিচিত। নিয়মানুযায়ী প্রেরণকারী হতে পারেন সমিতির নিজস্ব কর্মী বা পদ্ধতি গ্রহণকারীর আস্থাভাজন ব্যক্তি। তাঁদের ভোটার পরিচিতি নম্বরও থাকতে হয় সমিতিতে।
ওই সূত্র আরও জানায়, একজন সক্ষম পুরুষকে জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ রয়েছে ৩১৪০ টাকা। সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রেরণকারী বা দালালকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু সমিতির পক্ষ থেকে দেওয়া হয় আরও ২০০ টাকা। পদ্ধতি গ্রহণকারীকে দেওয়া হয় দুই হাজার টাকা। অস্ত্রোপচারকারী পান ৪০০ টাকা। টাকার জন্য দালালেরা পদ্ধতি গ্রহণকারীদের নানা প্রলোভনে সমিতির কার্যালয়ে নিয়ে আসেন।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে আশাদুল হক বলেন, যে যুবকের কথা বলে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের কার্যালয়ে পদ্ধতি গ্রহণকারী হিসেবে এমন কারও নাম নেই। তাহলে কেন থানায় গিয়ে আপসনামায় সই করেছেন—এর জবাবে তিনি বলেন, ‘পদ্ধতি এখানেই গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাঁরা দুই জায়গায় দুই নাম ব্যবহার করেছে।’ তাহলে দালাল ইচ্ছে করলেই যেকোনো নামের ব্যক্তিকে সমিতিতে এনে পদ্ধতি গ্রহণ করাতে পারেন—এ কথা বলা হলে কিছু বলতে বিব্রতবোধ করেন তিনি।
সমিতিতে দালালকে ২০০ টাকা বেশি দেওয়া হয় কেন—জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাড়তি টাকাটা সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়।
অস্ত্রোপচারকারী খাজা ফেরদৌস স্বীকার করেন, ওই যুবককে বন্ধ্যাকরণ করা ছিল একটা দুর্ঘটনা।
পরিবার পরিকল্পনা রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) নাসিম আক্তার বলেন, ‘এ বিষয়ে কেউ আমার কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। এখন শুনলাম। আমি এ ব্যাপারে যা করণীয় তা করব।’
এএইচ





