ইছামতী নদী সাঁতরে পার হচ্ছে গরুর পাল, পেছনে রাখাল। হাতবদলের পর এসব গরুর ঠাঁই হচ্ছে পুটখালী চরের মাঠের খাটালে। তারপর আবারও হাতবদল। পৌঁছে যাচ্ছে পুটখালীর হাটে।

এভাবেই যশোরের সীমান্ত দিয়ে স্রোতের মতো আসছে ভারতীয় গরু। লক্ষ্য আসন্ন কোরবানির ঈদের বাজার দখল। বৈধ-অবৈধ দুভাবেই গরু আসছে। সঙ্গে কিছু মহিষও আছে। দিনের তুলনায় রাতে আসছে বেশি।

পুটখালীর হাট। স্থানীয় সরকারি প্রাইমারি স্কুল মাঠ সংলগ্ন কিছু সরকারি আর বেসরকারি ফাঁকা মাঠে বছরের ৩৬৫ দিনই বসে এই হাট। এই হাটের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। ২৪ ঘণ্টা চলে বেচাকেনা। হাট মালিকদের নির্ধারিত ফি আর সরকারি কোষাগারে শুল্ক জমা দিয়ে এসব ভারতীয় চোরাই গরু হচ্ছে বৈধ। তারপর হাতবদলের মাধ্যমে যাচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় মোকামে বিক্রি হচ্ছে এসব ভারতীয় গরু। ট্রাক ভরে এসব গরু যাচ্ছে কোরবানির বাজারে। কিন্তু রাস্তায় ঝক্কিঝামেলার শেষ নেই। ঈদ সামনে করে মেতে উঠেছে নানাধর্মী চাঁদাবাজ। রাস্তায় বাঁশখুঁটি আর লাল পতাকা টাঙিয়ে এরা চাঁদা সংগ্রহে নামে। টার্গেট ভারতীয় গরুর ট্রাক।

জানা গেছে, বেনাপোলের পুটখালী থেকে গরু বোঝাই করে একটি ট্রাককে ঢাকার গাবতলী পর্যন্ত পৌঁছাতে রাস্তায় রাস্তায় গুনতে হয় ৪-৫ হাজার টাকা। অন্যথা হলেই বিপদ। লুট হচ্ছে গরুসহ ট্রাক। এমনকি খুনের শিকার হতে পারে ট্রাকের চালক ও হেলপার। খুন হতে পারেন গরুর ব্যাপারীও।

সেই গরুতে যশোরের পুটখালী এখন জমজমাট। বেচাকেনাও জমজমাট। পাশাপাশি নাভারণ, কলারোয়া, বাঁগআচড়া, চৌগাছার পুড়োপাড়া, ঝিকরগাছার বাঁকড়াসহ বিভিন্ন এলাকাতেও বসছে ভারতীয় গরুর হাট।
যশোর শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার পশ্চিমে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল। বেনাপোল থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সীমান্তঘেঁষা গ্রাম এই পুটখালী। এই গ্রামের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ইছামতী নদী। প্রমত্তা ইছামতীর পশ্চিম তীরে ভারতের বনগাঁ।

ইছামতীর পূর্বপাড়ে চরের মাঠ। এই চরের মাঠ এক ভয়ংকর জনপদ। এর চারপাশে জনবসতি থাকলেও মাঠটি রয়েছে ফাঁকা। বিশাল এই মাঠজুড়ে রয়েছে গরুর খাটাল বা খামার। ইছামতী নদী সাঁতরে আনা গরুর পাল প্রাথমিকভাবে এই খাটালে তোলা হয়। তারপর দরদাম করে তা পৌঁছে যায় ৩ কিলোমিটার দূরের পুটখালী হাটে।
এই চরের মাঠেই কথা হয় কয়েকজন গরুর রাখালের সঙ্গে। ধু-ধু মাঠে কয়েকটি টংঘর তুলে তারা বসে আছেন। তারা জানান, প্রতি ২৪ ঘণ্টায় এই নদী পেরিয়ে ৭-৮ হাজার গরু পুটখালী খাটালে ঢোকে।

এবার ভারতের হরিয়ানা, কর্ণাটক, দার্জিলিং, ওডিশা, মধ্যপ্রদেশ, হায়দরাবাদ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব গরু আসছে, তা উঁচু-লম্বায় বেশ বড়। অথচ গায়ে মাংস কম। স্থানীয় ব্যাপারীরা এসব গরু কম দামে কিনে নিয়ে ইনজেকশনের মাধ্যমে মোটাতাজা করে ফের বাজারে তুলছেন।

জানা গেছে, পুটখালী হাটে গরুপ্রতি সরকারি করিডরে ৫০০ টাকা, টোল ২০০ টাকা, হাট মালিকের ট্যাক্স ৩০০ টাকা, মাতুব্বরি চার্জ ২০০ টাকা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নামে ৩০০ টাকা, মিডিয়ার নামে ৫০ টাকা, ইউনিয়ন ট্যাক্স বাবদ ১০০ টাকা, সরকারি দলের অনুদান বাবদ ১০০ টাকা, স্থানীয় যুব ক্লাবের নামে ৫০ টাকাসহ মোট ২ হাজার টাকা দিতে হয়।

কথা হয় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ইশারত গাজীর সঙ্গে। তিনি ১০ বছর ধরে এই পুটখালী হাটে ব্যবসা করছেন। জানালেন, এবার গরুর আমদানি বেশি হলেও দাম মোটেই কম নয়। অথচ এবার এখানে গরুপ্রতি খরচাটা বেশি। ঢাকা পর্যন্ত ১০-১২টি গরু নিতে ট্রাক ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৩০-৪০ হাজার টাকা। পথে পথে চাঁদা গুনতে হচ্ছে ৪-৫ হাজার টাকা। সবকিছু মিলে এবারের ঈদে ব্যবসার যে কি হাল হবে তা বোঝা যাচ্ছে না।

কথা হয় হাট মালিক নাসিমুল গণি পিন্টুর সঙ্গে। তিনি জানান, এখানে কথায় কথায় চাঁদা দিতে হয়। না হলে হামলা আর লুটপাটের শিকার হতে হয়। মূলত এই হাট চলে রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায়।

হাটের সাব-ইজারাদার ঘেনা বিশ্বাস জানান, ইছামতী পার হতে প্রতিটি গরুর জন্য ঘাটমালিককে গুনতে হয় ২ হাজার টাকা। সেই হিসাবে প্রতিদিন এই ঘাটের টোল বাবদ আয় হয় ১ থেকে দেড় কোটি টাকা। এর ভাগ পান সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সরকারি দলের নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের লোকজনও।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফ্ফার জানান, এবার ভারতীয় গরুর আমদানি সুবিধাজনক বলে মনে হচ্ছে না। তবে এখনো সামনে সময় আছে দেখা যাক কী হয়।

হাটের ও ঘাটের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত খুলনার ২৩ বিজিবির সিও লে. কর্নেল আবদুল রহিম সাংবাদিকদের জানান, বেনাপোলের পুটখালী সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরুর আমদানি গত বছরের তুলনায় অনেক কম। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমদানি গতি পাবে।

ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, জেআই