‘আমার আবার ঈদ। পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি। বেঁচে থাকারও তো কোন অর্থ খুঁজে পাই না। শুধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে, তাকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে আছি। এই দেখেন, গত বছরের ঈদটাইতো আমার কাছে অন্যরকম ছিল। স্ত্রী, সন্তান, নাতি-নাতনি সবার সঙ্গে একত্রে কত আনন্দে ঈদ উদযাপন করেছি। কিন্তু দেখেন, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আজ আমার পরিবার বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই।’

গত ১৪ জুন মিরপুর কালশীর কুর্মিটোলা বিহারি পল্লীতে হামলা এবং অগ্নিসংযোগে পরিবারের ৯ সদস্যকে হারানোর পর ঈদ উদযাপন নিয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে এসব কথা বলেন ইয়াসিন আলী। এখন পরিবারের সদস্য বলতে তার ১৫ বছরের মেয়ে ফারজানা আক্তারই শুধু বেঁচে আছে। ওই ঘটনায় ফারজানাও অগ্নিদগ্ধ হয়। ঈদ উপলক্ষে ফারজানাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চারদিনের জন্য বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

ইয়াসিন আলী বলেন, ‘আমার এখন বেঁচে থাকার অবলম্বন হচ্ছে আমার মেয়ে। ওরে ঈদের কারণে গতকাল (সোমবার) হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে এসেছি। তাকে এখনও জানাইনি যে আমি ছাড়া পৃথিবীতে ওর কেউ নেই।’

এসব কথা বলতে বলতে ইয়াসিন আলীর কন্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। সে বারবার আগের ঈদের স্মৃতিচারণ করে হু হু করে কেঁদে উঠেন। তিনি বলেন, ‘গত ঈদে সবাইকে নতুন জামা কিনে দিয়েছি। এ নিয়ে সবার মধ্যে সে কি আনন্দ। সেই আনন্দ দেখে আমার মনটা ভরে উঠত। এতো আনন্দ কেন কেড়ে নিল আল্লাহ? তিনি কি একটু সদয় হতে পারতেন না?’

এদিকে ঘটনার দিন পুলিশের গুলিতে নিহত মো. আজাদের পরিবারেও নেই ঈদে আনন্দ। আজাদের স্ত্রী সুলতানা বলেন, ‘গত ঈদেও দুই ছেলেকে নিয়ে মার্কেট থেকে জামা কিনে দিয়েছি। এবার ছেলেদের কোনো জামা কাপড় কিনে দিতে পারিনি। কাল রাতে আমার ভাই তাদেরকে নতুন জামা কিনে দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কি অপরাধ করেছিলাম জীবনে এমন শাস্তি পেলাম? আমার সন্তানরা এতিম হলো, আমি বিধবা হলাম। একজন বিধবার ঈদ যে কত বিষাদময় এটা বলে বোঝানো যাবে না।’

ইয়াসিন আলী আর নিহত আজাদের পরিবারের শোকের মিছিলে যোগ দিয়েছে পুরো ক্যাম্পের অধিবাসীরা। পুরো বিহারি পল্লীতেই নেই ঈদের আনন্দ। তারা নেমে এসেছেন রাস্তায়। ক্যাম্পে হামলা এবং অগ্নিসংযোগে ১০ জন বিহারি নিহত হওয়ার পর প্রথম ঈদ পালন করছেন শোক প্রকাশ আর স্বজন হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে। ঈদের নামাজ আদায় করার পর সকাল থেকেই তারা কালো পতাকা বেঁধে শোক র‌্যালি এবং রাস্তায় অবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারা ঈদ পালন করছেন।

ক্যাম্পের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমরা কিসের ঈদ উদযাপন করব? আমরা স্বজনদের হারিয়েছি। স্বজন হারানোর পর কোনো আনন্দ থাকে না। আমরা তাই শোক পালন করছি।’

ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা জাহিদুর বলেন, ‘চাঁদ রাত থেকেই আমরা ঈদ উদযাপন শুরু করি। চকবাজার থেকে নিয়ে আসি আতশবাজি আর পটকা। কিন্তু এবার ক্যাম্পে কোনো পটকা ফোটেনি। কারও মনেই ঈদের আনন্দ নেই।’

বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকবে ক্যাম্পের অধিবাসীরা

স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির কুর্মিটোলা ক্যাম্পের প্রচার সম্পাদক হাসান বলেন, ‘এবারের ঈদ শোকের ঈদ। আমরা আমাদের শোককে শক্তিতে পরিণত করে হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকব। আমরা আজ ঈদের আনন্দ বাদ দিয়ে স্বজনদের স্মরণে শোক পালন করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কারা আমাদের স্বজনদের হত্যা করেছে সবাই তাদের চেনে। তবে কেন তাদের পুলিশ ধরছে না আমরা জানি।’

সরকারের প্রতি তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘সরকার যদি অবিলম্বে এই হত্যার বিচার না করে তবে এর ফল ভালো হবে না।’

সূত্র: দ্য রিপোর্ট

ঢাকা, ২৯ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) //জেডআই