পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী বাঙ্গালীদের নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এসব এলাকার বাঙ্গালীরা যাতে চাকরিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সনদপত্র গ্রহণ করতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

বর্তমানে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সনদপত্র দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে তিন জেলার জেলা প্রশাসক এবং সার্কেল চিফগণের হাতে। এতে অবাঙ্গালী এবং বাঙ্গালী উভয়েরই স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু, জেলা প্রশাসকগণের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে এখন শুধুমাত্র সার্কেল চিফগণের হাতে স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানের ক্ষমতা অর্পণের চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যে আজ রোববার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক ডাকা হয়েছে।

লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক সচিবের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নুর স্বাক্ষরিত এই সভার নোটিসে বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ কে হবেন সে বিষয়ে মতামত প্রদানের জন্য লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগকে অনুরোধ করেছে।

উক্ত বিষয়ে Chittagong Hill Tracts Regulations, 1900,১৯০০, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনে বর্ণিত আইনগত ব্যবস্থা পর্যালোচনাক্রমে পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ নির্ধারণের নিমিত্ত আগামী ২০ ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখ, রোজ রবিবার, বেলা: ৩ ঘটিকায় লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব মহোদয়ের সভাপতিত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে (কক্ষ নং ৬১৯, ৭ম তলা, ৪ নং বিল্ডিং) একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে।”

অথচ দেখা যাচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় স্থায়ী নাগরিক সনদপত্র প্রদানের কর্তৃপক্ষ কে হবেন এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে একাধিক চিঠিতে পরিষ্কার করা হয়েছে। ২০০১ সালের ১১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে পরিষ্কারভাবে নির্দেশনাও দেয়া হয়।

মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব (প-১) মোহসিনা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই মর্মে বলা হয় যে, “তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের স্থায়ী সনদ কোন্ কর্তৃপক্ষ প্রদান করবেন সে বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে (১৯৯৮ সালে জারিকৃত) কোনো বিধান করা হয়নি। পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ এর পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থীতার ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী উপজাতি বা অ-উপজাতি কিনা সে বিষয়ে প্রত্যয়নের ক্ষমতা সার্কেল চিফগণকে প্রদান করা হইয়াছে। এক্ষেত্রে বর্ণিত আইনে স্থায়ী বাসিন্দা সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা রদ করা হয়নি।”

চিঠিতে আরো বলা হয়, “সনদপত্র প্রদানের বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টির প্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণ করা হয়। আইন মন্ত্রণালয় পার্বত্য জেলা পরিষদের আইন পর্যালোচনাক্রমে, পার্বত্য জেলাসমূহের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগণ পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের চাকরিসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে আইনগত মতামত ব্যক্ত করেছেন।”

চিঠিতে আরো বলা হয়, “যেহেতু পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৮৯ ও উহার সংশোধনীতে পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের সনদ প্রদানের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতা রহিত/রদ করে কোনো বিধান করা হয়নি সেহেতু আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুসরণে জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি সার্কেল চিফগণও পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের চাকরিসহ সকল প্রয়োজনে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন মর্মে পুনরায় নির্দেশনা দেয়া হলো। তবে পার্বত্য জেলার অধিবাসী হিসেবে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ কোনোভাবেই পার্বত্য জেলার অধিবাসী নন এমন কাউকে স্থায়ী বাসিন্দার সনদ প্রদান করা যাবে না।”

এছাড়া ২০০১ সালের ২১ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আরেক চিঠিতে ‘তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক কর্তৃক স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানের বিদ্যমান ক্ষমতার পাশাপাশি তিন সার্কেল চিফগণও চাকরির প্রয়োজনে নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদান করতে পারবেন’ মর্মে নির্দেশনা দেয়া হয়।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ কে বা কারা- এ সম্পর্কে সবকিছু বার বারই পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। তারপরও এখন আবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই বিষয়ে কেন বৈঠক ডাকা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থায়ী বাসিন্দা সনদ প্রদানের ক্ষমতা জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়াই এ বৈঠকের উদ্দেশ্য। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালীদের পক্ষে আর স্থায়ী বাসিন্দার সনদ পাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ, সার্কেল চিফগণ উপজাতি। এরা কখনো বাঙ্গালীদেরকে স্থায়ী সনদ প্রদান করবেন না।

এমএ