ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ বিভাগ সূত্র জানায়, ২০২০ সালে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিতে ১২ হাজার ৫১৩টি তালাকের আবেদন করা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ১ হাজার ৪২টির বেশি, যা দিনে গড়ে ৩৫টি, ঘণ্টায় একটিরও বেশি। এসব তালাকের কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা না হওয়া’।
ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি’র মেয়র দফতরের তথ্য মতে, চলতি (২০২১) বছরের ০১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে তালাকের আবেদন করেছেন ৫ হাজার ৪৮৭ জন। এর মধ্যে ডিএনসিসি’তে আবেদন ২ হাজার ৮২৫টি, ডিএসসিসি’তে ২ হাজার ৬৬২টি। এই হিসেবে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসিতে দিনে ৩৭টি তালাকের আবেদন পড়ছে। যা ঘণ্টায় ১ দশমিক ৫ এরও বেশি।
এর আগে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএসসিসি এবং ডিএনসিসি’তে তালাকের আবেদন করেন ১২ হাজার ৫১৩ জন। যা দিনে গড়ে ৩৪টি। এই হিসেবে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দিনে গড়ে তিনটি করে তালাক আবেদন বাড়ছে।
বর্তমানে ডিএনসিসি’র পৃথক ১০টি অঞ্চল রয়েছে। কোনো অঞ্চলে দিনে বা মাসে কয়টি তালাক হয় তার হিসেব রাখে মেয়র দফতর। এই দফতর সূত্র জানায়, ডিএনসিসি এলাকার মধ্যে অঞ্চল-৩ এর আওতাধীন এলাকা তথা গুলশান, বনানী, বারিধারা, মহাখালী, রামপুরা এলাকায় তালাকের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
ডিএনসিসি’র অঞ্চল-৩ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, স্বামী বা স্ত্রী যে পক্ষই আবেদন করুক, আগে উভয়পক্ষকেই সমঝোতার নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সমঝোতায় যান না। উভয়েই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকেন। দ্বিতীয়বার নোটিশ দিলেও তারা উপস্থিত হন না। আইন অনুযায়ী তালাক আবেদনের ৯০ দিনের মধ্যে সমঝোতা না হলে তা কার্যকর হয়ে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে ঢাকায় তালাকের প্রবণতা বাড়ছে। এর মধ্যে শিক্ষিত স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে তালাক বেশি হচ্ছে। ২০১৯ সালের জুন মাসে প্রকাশিত বিবিএসের ‘দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে তালাকের ঘটনা ১৭ শতাংশ বেড়েছে।
ডিএসসিসি’র জনসংযোগ বিভাগ জানায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএসসিসিতে তালাকের আবেদন করেছেন ৬ হাজার ৩৪৫ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪২৮টি আবেদন করেছেন নারী বা স্ত্রীরা। ১ হাজার ৯১৭টি আবেদন স্বামীর। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ১ হাজার ৯৫৩টি তালাকের আবেদন করেছেন স্ত্রী, স্বামী ৭০৯টি। এর মধ্যে গত মার্চে ৬০২টি তালাক আবেদনের ৪৮৬টিই স্ত্রীদের।
অন্যদিকে, ডিএনসিসি’তে ২০২০ সালে তালাকের আবেদন করেছেন ৬ হাজার ১৬৮ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫৩টি আবেদনই স্ত্রীর পক্ষ থেকে। এছাড়া চলতি (২০২১) বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আবেদন পড়েছে ২ হাজার ৮২৫টি। এর অধিকাংশ আবেদনই নারীদের বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিএসসিসিতে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের পক্ষে তালাকের আবেদনগুলো তদারকি করেন সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাছের। তিনি বলেন, বছরে যে পরিমাণ তালাকের আবেদন করা হয়, তার গড়ে ৭০ শতাংশই স্ত্রীদের। স্বামীদের আবেদন কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, “একটা পরিবার গড়ে ওঠে একজন পুরুষ এবং নারীর বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে। এর মাধ্যমেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু এখন কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার পার্থক্য, প্রতিযোগিতার সঙ্গে নিজেকে চালিয়ে যাওয়া এবং সেগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পাড়ায় নারী-পুরুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে। ফলে বাস্তবতা এবং প্রতিযোগিতার সঙ্গে টিকে থাকতে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।” তিনি বলেন, “এখন প্রতিযোগিতামূলক সমাজ। মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। এই আকাঙ্ক্ষা আদি সমাজের সঙ্গে বর্তমান সমাজের পার্থক্য তৈরি করেছে। অথচ আগে যুগের পর যুগ সংসার টিকে থাকত।”
মুস্তাঈন





