যে মুহূর্তে ঘরে-বাইরে বিপরীতমুখী চাপ বাড়ছে, সে মুহূর্তে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও গণতন্ত্রীপন্থী নেত্রী অং সান সু চি তাঁর দেশের জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার এই ভাষণ দেওয়ার কথা।
এই ভাষণে কী থাকবে, তা নিয়ে মিয়ানমারের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, সু চি কী বলবেন? কী করবেন? তিনি কি তাঁর দেশের উগ্রবাদীদের জাতিবিদ্বেষকে উসকে দেবেন, না আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন?
তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ভাষায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের শেষ সুযোগটি নেবেন, না নিপীড়ক সেনাবাহিনীকে সমর্থন করে যাবেন?
মিয়ানমারের গত তিন সপ্তাহের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু পাওয়া যায় না। প্রথম থেকে অং সান সু চি মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ছিলেন খুবই নিস্পৃহ। মিয়ানমারের অন্যান্য নেতার মতো তিনিও তাঁদের নাগরিক মনে করেন না। ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিতে তাঁর আপত্তি।
একবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গা সমস্যাটি নিয়ে কথা বলতে গেলে সু চি তাঁকে সংশোধন করে বলেন, ‘রোহিঙ্গা’ বলবেন না। সু চি নিজেকে ‘বর্মি’ বলতে গর্ববোধ করেন। অথচ রোহিঙ্গাদের ‘রোহিঙ্গা’ বলতে তাঁর আপত্তি। একেই বলে জাতিগত অহংবোধ, যা শান্তির নোবেল মুছে ফেলতে পারে না।
আগের কথা বাদ দিলেও ২০১২ সাল থেকে রোহিঙ্গারা একের পর এক হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে সু চি একটি কথাও বলেননি। অথচ সু চি যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেননি বা সেনাবাহিনীর অধীনে বিরোধী দলের নেতার পালক মাথায় গোঁজেননি, তখন বলতেন, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে এসব জাতিগত বিরোধেরও নিষ্পত্তি ঘটবে।
গত দুই বছরে অং সান সু চি ইতিবাচক যে কাজটি করেছেন, তা হলো রাখাইন রাজ্যের সংকট সমাধানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন। কিন্তু গত ২৪ আগস্ট সেই কমিশন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই রাখাইনের বিভিন্ন সেনা ও পুলিশচৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাও রহস্যজনক।
এরপর হামলাকারীদের ধরা বা মারার নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নিরীহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্যাতন ও গণহত্যা চালায়, তা নজিরবিহীন। তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, রোহিঙ্গাদের নিজেদের ঘরবাড়িতে আগুন দিতে বাধ্য করেছে এবং এরপর ঘোষণা করেছে, না পালালে গুলি করে হত্যা করা হবে।
বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের অমানবিকতা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
এই হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যখন প্রতিবাদ ও নিন্দা চলছে, তখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রধান মিন অং লেইং নির্যাতনের পক্ষে সাফাই গাইতে বলেছেন, ‘তারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে অথচ তারা কখনো মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী ছিল না। এটি ‘‘বাঙালি’’ ইস্যু। আর এই সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাদের একতাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
কিসের জন্য ঐক্যবদ্ধ হবেন তাঁরা? বাকি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকেও হত্যা কিংবা দেশান্তরী করার জন্য?
মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা বাহিনীর বর্বরতা রোধে গণতন্ত্রীপন্থী নেত্রী সু চিকে শেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে হুঁশিয়ারি জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজ। তিনি বলেছেন, মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেই সেনাদের সাঁড়াশি অভিযান বন্ধে শেষ সুযোগ পাবেন সু চি।
তিনি যদি অবস্থার পরিবর্তন না করেন, তাহলে আমি মনে করি, এই ট্র্যাজেডি ভয়াবহ রূপ নেবে এবং এরপর নিরাশার সঙ্গে বলতে হবে, আগামী দিনে এই সমস্যা কীভাবে বদলাবে, তার দিশা আমি দেখছি না।’ আমরা জানি না সু চির কানে এই হুঁশিয়ারি পৌঁছেছে কি না?
গুতেরেজের কণ্ঠে বিশ্বের শান্তিকামী ও ন্যায়বাদী মানুষের কণ্ঠই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তিনি নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী ধর্মযাজক ডায়মন্ড টুটুও সু চির কাছে লেখা চিঠিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়ে তাঁকে নীরবতা ভাঙতে বলেছিলেন।
যখন রাখাইন রাজ্য জ্বলছে এবং রোহিঙ্গারা দলে দলে পালাচ্ছে, তখন সু চি তাঁর ভাষণ তৈরি করছেন। তাঁর জন্য দুদিকেই বিপদ অপেক্ষা করছে। তিনি যদি বিশ্বজনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, মানবিক হন, তাহলে সেনাবাহিনী ফের স্বরূপে আবির্ভূত হতে পারে। দেশটিতে ফের সেনাশাসন জারি হতে পারে।
গত ২৫ আগস্ট সন্ত্রাসী হামলার পর সেনাবাহিনী পরিচালিত ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি।
অনেক বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের প্রকৃত ক্ষমতা এখনো সেনাবাহিনীর হাতে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয় তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসনও সেনাসদস্যদের জন্য সংরক্ষিত।
এ কারণে ২০১৫ সালের নির্বাচনে অং সান সু চির দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হলেও তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধানে কোনো নাগরিকের স্বামী বিদেশি হলে কিংবা সন্তান বিদেশে থাকলে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না বলে আইন করা হয়।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সু চির পক্ষে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব হবে না। বিরুদ্ধে গেলে সেখানে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। কিন্তু তাই বলে অহিংস আন্দোলনের নেত্রী কি হিংসার পথ বেছে নেবেন?
তাহলে তো মিয়ানমারের নিপীড়ক সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের হাতে দেড় দশকেরও বেশি সময় বন্দী থাকা অং সান সু চির কোনো পার্থক্য থাকে না।
এখন সু চিই ঠিক করুন তিনি কী করবেন।
এমএ





