ফের পায়রা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার লেবুখালী প্রতিরক্ষা বাঁধ। নদীটির দক্ষিণপাড়ের এই প্রতিরক্ষা বাঁধটি ভেঙে নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে বাঁধ এলাকার পাঁচ গ্রামের মানুষ চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
জোয়ারের পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে পায়রার প্রবল স্রোতে প্রতিরক্ষা বাঁধের পাঁচটি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে লেবুখালী ফেরিঘাটের দুই দিকে ৫০০ মিটারের বেশি বাঁধের ব্লক ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা বিরাজ করছে।
জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধ করা না হলে লেবুখালী ফেরিঘাটটিও নদী গর্ভে বিলীন হয়ে পটুয়াখালী-বরিশাল সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। বাঁধের ভেঙে যাওয়া পয়েন্ট দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে লেবুখালী, মোল্লাখালী, মরিচের খাল, আলগী ও পাঙ্গাশিয়া এই পাঁচ গ্রামের ফসলী জমি প্লাবিত হচ্ছে। ফলে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন এ পাঁচ গ্রামের মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পটুয়াখালী কার্যালয় জানায়, পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে দুমকি উপজেলায় পায়রা নদীর ভাঙন থেকে লেবুখালী ফেরিঘাট, বাজারের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো ও এলাকার বসতবাড়িসহ ফসলী জমি রক্ষায় এই প্রতিরক্ষা বাঁধটি নির্মাণ করে পাউবো। ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে পাউবো ফেরিঘাটের পূর্ব দিকে ২০০ মিটার ও পশ্চিম দিকে এক হাজার মিটার ব্লক দিয়ে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। ২০০৭ সালে সিডর ও ২০০৯ সালে আইলায় এতে ব্যাপক ভাঙ্গন দেখা দেয়। পরের বছরগুলোতেও ভাঙ্গন অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানির প্রবল চাপে বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন বাড়তে থাকে।
পাউবো আরও জানায়, ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে লেবুখালী প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন ঠেকাতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ধসে পড়া স্থানগুলোতে ‘জিউ ব্যাগ’ (বালুর বস্তা) ফেলে মেরামত করে ভাঙন ঠেকানো হয়েছিল। এতে ব্যয় হয়েছিল মোট ১৯ লাখ টাকা।
এবারও জোয়ার-ভাটার তীব্রতার কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে ফেরিঘাট সংলগ্ন বাঁধের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দুটি পয়েন্টে ৫০০ মিটারেরও বেশি বাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে যায় ও বাঁধের ভেতরে পানি প্রবেশ করে। বাঁধের ব্লকগুলো ধসে নদী গর্ভে বিলীন হওয়া অব্যাহত রয়েছে।
বাঁধের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত লেবুখালী গ্রামের বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন ফরাজী বলেন, ‘খরস্রোতা পায়রা নদীর গ্রাসে লেবুখালী অংশ এমনিতেই ভাঙন কবলিত। এ ছাড়াও প্রতিরক্ষা বাঁধটি নির্মাণের সময় যেনতেনভাবে ব্লক ফেলে কাজ সারা হয়েছিল। ফলে বাঁধের নিচের অংশের ব্লকগুলো সরে গিয়ে ধস নেমেছে। বালুর বস্তা ফেলা হলেও বাঁধের ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা না হলে পুরো বাঁধটিই ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, তাদের বসতবাড়িসহ ফসলী জমিও নদীগর্ভে বিলীন হবে।’
লেবুখালী ফেরীঘাটের বাসিন্দা দেলোয়ার আকন্দ জানান, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের ভাঙনের তীব্রতা অনেক বেশি। যেভাবে বাঁধ ভাঙছে তাতে বাঁধের ভেতরের শতাধিক পরিবারের জীবন-জীবকা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। পৈত্রিক ভিটেবাড়ি হারানোর চিন্তায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে অনেকেই।’
লেবুখালী গ্রামের বাসিন্দা কাসেম হাওলাদার বলেন, ‘এমনিতেই নদীর পাড়ে বাড়ি হওয়ায় সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। বর্ষা মৌসুম আসা মাত্রই বাঁধ নতুন করে ভাঙতে শুরু করেছে। এখন বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢোকে। বাঁধ মেরামত না হলে জোয়ারের পানিতে লেবুখালী, মোল্লাখালী, মরিচের খাল, আলগী ও পাঙ্গাশিয়া এই পাঁচ গ্রামের ফসলী জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
লেবুখালী ইউনিয়নের সাবেক সদস্য দেলোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ‘বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে শুধু পাঁচটি গ্রামই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, লেবুখালী ফেরিঘাটটিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হবে। জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী ও মজবুত প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙনের ফলে ফেরিঘাটটিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পন্টুনের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ফেরিঘাটটি।’
পাউবো, পটুয়াখালীর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবু বকর ভূঁইয়া বলেন, ‘পায়রা নদীর গভীরতা ও প্রবল স্রোতের কারণে লেবুখালী প্রতিরক্ষা বাঁধে আগেই ভাঙন দেখা দিয়েছিল। গত বছর বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানো হয়েছিল। তবে এ বছর এক সপ্তাহ ধরে নদীতে পানির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও জোয়ার-ভাটার প্রবল চাপে অন্তত ৫০০ মিটার নতুন করে ভেঙে গেছে। স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করতে হলে অন্তত পাঁচ কোটি টাকার প্রয়োজন। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
ঢাকা, ৭ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) // জেআই





