কিশোর প্রেমের বলি স্কুলছাত্রী তাসপিয়া। ফেসবুক প্রেমের সূত্র। প্রেমের এক মাসের মাথায় তাকে চলে যেতে হলো পরপারে।

প্রথমে অজ্ঞাত লাশ হিসেবে উদ্ধার হলেও পরে পরিচয় মিলেছে নবম শ্রেণীর পড়ুয়া স্কুল ছ্ত্রী।

বুধবার ২ মে সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর পাড় থেকে উদ্ধার করা হয় তার লাশ। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকার ১৮ নম্বর ব্রিজের উত্তর পাশে পাথরের উপর উপুর হয়ে পড়েছিল লাশটি।

নগরীর সানশাইন ইংলিশ গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসপিয়া। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে অজ্ঞাত হিসেবে মরদেহ উদ্ধার করার পর বিকালে তার পরিচয় পাওয়া যায় বলে জানায় পতেঙ্গা থানা পুলিশ।


পতেঙ্গা থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন জানান, সকালে স্থানীয় পথচারীরা মৃতদেহটি দেখতে পেয়ে থানায় খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মৃতদেহটি উদ্ধার করে। একই সাথে সিআইডি সংগ্রহ করেছে মরদেহের সকল তথ্য-উপাত্ত। আগামীকাল সকালে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে তাসপিয়ার লাশ হস্তান্তর করা হবে।

এ ঘটনায় তাসপিয়ার কিশোর প্রেমিক আদনান মির্জাকে আটক করেছে পুলিশ। আদনান নগরীর দক্ষিণ খুলশী এলাকায় থাকে। তাদের গ্রামের বাড়ি লোহাগাড়ার পদুয়া ইউনিয়নে। আর পড়ালেখা সানশাইন গ্রামার স্কুলেই। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর ওআর নিজাম রোডের গোল পাহাড় মোড়ে চায়না গ্রিল নামে একটি রেস্টুরেন্টে প্রেমের এক মাস পূর্তি উৎসবে মিলিত হয় তাসপিয়া ও আদনান। সেখানে প্রায় ২০ মিনিট অবস্থান করে তারা দুজন।

রেস্টুরেন্টের বয় উজ্জ্বল জানান, মঙ্গলবার শবেবরাত ও মে দিবসের ছুটির কারণে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রেস্টুরেন্ট খোলা হয়। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর অর্থাৎ ৫টা ২০ মিনিটের দিকে রেস্টুরেন্টে আসে এক তুরণ-তরুণী যুগল। তারা রেস্টুরেন্টের ৮নং কেবিনে বসে।

এরপর খাবার অর্ডার নিতে গেলে শুধুমাত্র ২টা আইসক্রিম অর্ডার করে তারা। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট অবস্থানের পর চলে যায়।

তাসপিয়ার বাবা (মো. আমিন) সাথে কথা বলে জানাযায়, আগে থেকেই আদনানের সাথে তাসপিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি জানা ছিল তার। তাসফিয়া বাসা থেকে কাউকে না বলেই বেরিয়ে গেছে। নামাজ পড়ে এসে তাকে বাসায় না পাওয়ায় বিচলিত হন বাবা।

খোঁজাখুঁজির পর তাসপিয়াকে না পেয়ে তার বন্ধুদের কাছ থেকে আদনানের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন বাবা। এরপর কল করে আনা হয় আদনানকে। তাকে নিয়ে মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে যান তারা। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করেন।

এদিগে, আদনানও স্বীকার করে এক সাথে রেস্টুরেন্টে খাওয়ার কথা। এরপর তাসপিয়াকে আদনান সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দিয়েছিল বলেও জানায়। মঙ্গলবার বিকেল ৬টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ঘটনা আদনানের স্বীকারোক্তির সাথে মিলছিল।

সিসিটিভি ফুটেজও বলছে একই কথা। তবে এর পরের ঘটনা উল্টো। অভিযোগ করা হয় নগরের পাঁচলাইশ থানায়। পুলিশ রাত সাড়ে ৯টার দিকে আদনানকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এ সময় ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আদনানকে। সেখানে প্রায় দুই-দেড় ঘণ্টার মাথায় আদনানের দুই বড়ভাই সন্ত্রাসী ফিরোজ ও আকরাম তাসপিয়াকে বাসায় পাঠানোর শর্তে ছাড়িয়ে নেয় আদনানকে।

রফিকুল ইসলাম নামে তাসপিয়াদের এক নিকটাত্মীয় জানান, সন্ধ্যায় যখন তাসপিয়াকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন তাসপিয়ার মা বেগম আমিন আদনানকে মোবাইল ফোন করে বাসায় ডাকেন। রাত ৮টার দিকে আদনান ওআর নিজাম রোডে তাসপিয়াদের বাসার সামনে গিয়ে তাসপিয়ার মায়ের সাথে দেখা করে। এ সময় তাসপিয়া কোথায় জানতে চাইলে আদনান জানায় রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়েই তাসপিয়া বাসায় চলে এসেছে। তবে তাসপিয়া সে সময়ও বাসায় ফিরেনি।

এ ঘটনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, সকালে তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধারের পর দুপুরের দিকে তাসপিয়াকে শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা। এর আগে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি ও সিআইডি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে।

বিকেল ৫টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় ময়নাতদন্তের জন্য। আনোয়ার জানান, তাসপিয়াকে পাথরের উপর উপুর হয়ে পড়ে থাকাবস্থায় পাওয়া গেছে। পরনে হালকা গোলাপি সালোয়ার কামিস। গায়ের রঙ ফর্সা। তবে দুই চোখ ও হাঁটুতে হাল্কা আঘাতের চিহ্ন আছে। মুখের মধ্যে ফেনা ছিল।

ধর্ষণ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে এই তদন্তকারী অফিসার জানান, সেটা সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে বলা যাবে। সে ব্যাপারে সিআইডি তাদের প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে। এছাড়া তাসপিয়ার বয়ফ্রেন্ড আদনানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর বলা যাবে ঘটনাটি কী। বিকেল ৫টায় নগরীর পতেঙ্গা থানা থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাসপিয়ার মৃতদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে আসেন পুলিশ সদস্য আরাফাত।

তাসফিয়ার চাচা নুরুল আমিন জানান, তাসপিয়া পরিবারের সবার বড়। গ্রামের বাড়ি টেকনাফে।

মাসুম/এএস