বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সেদিনের বিকেলটা ছিল নিস্তরঙ্গ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে এদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং বর্বরতম গ্রেনেড হামলাটি হয়। রক্তস্নাত এভিনিউ জুড়ে আর্তচিৎকারের শব্দে ভারি হয়ে উঠেছিল সেদিনের আকাশ বাতাস।
স্মম্ভিত পুরো জাতি। ব্যথিত হয়েছিল পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে যাওয়া প্রতিটা বাঙ্গালী। আত্ম মননে দেহে শোকাহত। আসুন অতীত খুড়ে দেখি নেই সেদিন কি ঘটেছিল।

সেদিন যা হয়েছিলো: পার্টি অফিসের সামনের সড়কে একটা খোলা ট্রাকে ছিল অস্থায়ী মঞ্চ। দলের প্রায় সকল প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বসা ছিলেন ওই মঞ্চে । কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ ছিলেন সেই মঞ্চের আশেপাশে। ঘাতকদের পরিকল্পিত হামলাটির প্রথম গ্রেনেডটি থেকে শেষতম গ্রেনেডটিও নিক্ষিপ্ত হয়েছিল এই মঞ্চটিকে কেন্দ্র করে।


একের পর এক ঘাতকের উপর্যূপরি গ্রেনেড হামলায় পন্ড হয়ে গেছে সেদিনকার সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশটি। শতশত রক্তাক্ত মানুষের ভীরে চিরতরে হারিয়ে গেল ৩৪ টি তাজা প্রান। না, সেদিন বিকেল বেলায় প্রিয়মূখগুলোর কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে আসেননি তারা। অথচ সাদা কাপড়ে মুড়ানো সন্ধ্যায় কফিনের মায়ায় ছেড়ে যেতে হলো তাদের প্রিয় মাতৃকার কোল।

হামলার পরবর্তী ভাষ্য থেকে আমরা জানতে পারি প্রথম গ্রেনেডটি শেখ হাসিনার বক্তব্যের ২০ মিনিটের মধ্যেই তার উপর নিক্ষিপ্ত হয়, এবং সেটি গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়, বিস্ফোরিত হতে দু/এক সেকেন্ড বেশী সময় নেয়। আর ক্ষুদ্র সময়ের এই হেরফেরেই প্রানে বেচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। আত্মাহুতির পালায় সেবার নেতৃত্ব দেন আইভি রহমান। বিক্ষত দেহ তবু ঘাতকের গ্রেনেডের কি সাধ্য ভাঙে সেই মানব দেয়াল। নিরেট এবং নিশ্চিদ্র সে দেয়ালের খসে পড়া একটা ইটের জায়গা নেয় হাজার। ছুটে আসা আগুন মুখো স্পিন্টারেরা গন্তব্য খুজে পায়না।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক অর্নিদিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু একটি মিস্টিরিয়াস তথ্য ছাপে ২০০৮ সালে। তারা ধারনা দিতে চায় ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সাথে উলফারা জড়িত। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাটির তদন্তের সাথে জড়িত হয়েছিল এফবিআই। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট সরকারের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কিত বেশ কিছু স্পর্শকাতর তথ্য সম্বলিত দলিল তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে একটি অর্নিদিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাতে বেশ কিছু কাপন ধরানো তথ্য সন্নিবেশিত আছে মর্মে জানা গেলেও গোপনীয়তা ভেঙে সে সম্পর্কে কোন তথ্য কেউ জানাতে পারেননি।

এখন পর্যন্ত পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সেদিনের হামলা পরিচালনার মূল দলটির সাথে আরো দুটি ব্যাকআপ টিম ছিল বলে ধারনা পাওয়া গেছে। মুলদলটি অবস্থান নিয়েছি বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের উচু বিল্ডিংগুলোর ছাদে। যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান নেয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় দলটি ছিল গোলাপ শাহ মাজারের কাছাকাছি। আর তৃতীয় দলটি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছিল সভাস্থলের নিকটবর্তী স্থানে। গোয়েন্দাদের ধারনা অনুযায়ী মুলদলটি গঠিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী কতিপয় দুষ্কৃতি নিয়ে। যাদের মধ্যে ফারুক ও অন্য দুয়েকজনকে ঢাকা সেন্টাল জেল থেকে বের করে আনা হয়েছিল। মহিউদ্দিন সহ অন্যরা থাইল্যান্ড হয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। এদের মিশন ছিল গ্রেনেড ছুড়ে হত্যাকান্ডটি সম্পন্ন করা। দ্বিতীয় দলটি ছিল জামায়াতুল মুজাহিদীন ও হরকাতুল জিহাদের হাইলি ট্রেইন্ড কতিপয় জঙ্গির সমন্বয়ে গঠিত। তাদের হাতে ছিল অত্যাধুনিক অটোমোটেড রাইফেল, স্মল আর্মস এবং গ্রেনেড। এদের দায়িত্ব ছিল টার্গেট হামলা থেকে বেঁচে পালিয়ে যাবার পথে গুলি ও গ্রেনেড চালিয়ে মিশন সম্পন্ন করা। তৃতীয় দল যারা সভাস্থলের কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছিল তারা ছিল ভারতীয় উগ্রপন্থী উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার বাচাই করা একটা দল। এদের অস্ত্র ছিল অটোমোটেড রাইফেল। এদের দায়িত্ব ছিল প্রথম টিম টার্গেট মিস করলে সেটা গুলি চালিয়ে সম্পন্ন করা।

হামলায় প্রতিটা টিমের আসা যাওয়ার পথ ছিল ভিন্ন। কোন দলই অন্য দল সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল না। মুল দলটি ছাড়া অন্যদের নিজেদের নির্দিষ্ট যানবাহন ছিল। অভিযোগ আছে মুলদলটিকে এসকর্ট করেছে সরকারী কোন একটি সংস্থা। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে মুলদলের টার্গেট প্রাকটেসিং করে কিন্তু আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতারা মানব বর্ম হয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ধরেন, ফলে প্রথম টিমের মিশন ব্যর্থ হয়ে যায়। প্রথম দলটি ব্যর্থ হলে আওয়ামীলীগের কর্মী ও শেখ হাসিনার দেহরক্ষীরা দ্রুত তাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে নিযে আসেন এবং বুলেট প্রুফ গাড়িতে তুলে দেয়।

এ সময়ের মাঝে তৃতীয় দল টার্গেট কে দেখতে পেয়ে গুলি চালায়, দেহরক্ষী মাহবুব বুক পেতে সব কটা গুলি হজম করে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে গাড়িতে তুলে দিয়ে শেষ নিদ্রায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তৃতীয় দলটি টার্গেটকে মিস করলে দ্বিতীয় দলটির হামলা শেখ হাসিনার ড্রাইভারের বুদ্ধিমত্তার কাছে হেরে যায়। পাংচার হওয়া চাকা নিয়ে প্রচন্ড বেগে ছুটে শেখ হাসিনাকে নিরাপদ স্থানে পৌছে দেয় সে। ব্যর্থ হয় ২১ আগস্ট কিলিং মিশন। অত্যন্ত সুসমন্বিত একটা পরিকল্পনা শেখ হাসিনার কিছু বেকুব সমর্থকের পাগলামির কারনে ভেস্তে যায়। তারেকের নতুন জন্মদিনের কেক থেকে বঞ্চিত হয় জাতি ।
এ ঘটনায় তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদ প্রধান মুফতি হান্নান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।

২১ শে আগস্ট সর্ম্পকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক অর্থ উপমন্ত্রী এ.ফ.এ.ম ফখরুল ইসলাম মুন্সী বলেন, ২১ আগস্ট বাঙ্গালী জাতির জন্য একটি কলংকময় অধ্যায়। একটি ঘৃণ্যতম কালোদিন। নৃশংস এ হামলায় যারা নিহত হয়েছেন জাতি কোন দিনও ভূলবেনা তাদের এ আত্মত্যাগের কথা। সেই চক্রান্ত শক্তি আজও সক্রিয় বাংলাদেশের উন্নয়নে কে থমকে দিতে ব্যস্ত । তাদের এ স্বপ্ন পূরণ হবে না।

তথ্যসূত্র- ইন্টারনেট

এসএ