কুষ্টিয়ায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে শতাধিক রোগ নির্ণয়কেন্দ্র। নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাঞ্ছনীয়। কিন্ত ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে এসব রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলো।
সুত্র জানায়, জেলার বেশিরভাগ রোগ নির্ণয়কেন্দ্রের বর্জ্য নষ্ট ও শোধন ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। ফলে এসব বর্জ্য নষ্ট কিংবা শোধনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তা যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে।এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০১০ অনুযায়ী যে কোনো বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্র নিবন্ধিত হওয়ার আগেই পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক।
এ আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের মালিককে কমপক্ষে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড বা কমপক্ষে এক লাখ টাকা জরিমানা বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডই হতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক আব্দুস সালাম বলেন, পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকলে আইন অনুযায়ী কোনো বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল বা রোগ নির্ণয়কেন্দ্র অনুমোদন পেতে পারে না।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুষ্টিয়ায় দেড় শতাধিক সরকারি-বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক ও হাসপাতাল রয়েছে যার বেশির ভাগেরই পরিবেশ ছাড়পত্র নেই।
জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়ায় ১৫০টি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক রয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৩০টি, মিরপুর উপজেলায় ৫টি, ভেড়ামারা উপজেলায় ১১টি, কুমারখালী উপজেলায় ৬টি, দৌলতপুর উপজেলায় ১৩টি, এবং খোকশা উপজেলায় ২টি ক্লিনিক রয়েছে।
সুত্র জানায়, জেলায় বর্তমানে লাইসেন্সধারী ৫৪টি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার রয়েছে। যার মধ্যে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ৩৫টি, ভেড়ামারায় ৮টি, দৌলতপুরে ৩টি, কুমারখালীতে ৬টি, মিরপুরে ১টি।
সুত্র মতে, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কাশেম ক্লিনিক, সার্জিক্যাল, কুতুব উদ্দিন মেমোরিয়াল হাসপাতাল, আয়েশা ক্লিনিক, সনো হসপিটাল, সামসুজ্জামান মেমোরিয়াল হাসপাতাল, মরিয়ম ক্লিনিক, লালন শাহ হাসপাতাল, পদ্মা ক্লিনিক, আল-কোরণী মেডিক্যাল সেন্টার, আদ-দ্বীন হাসপাতাল, নূরুন নাহার জেনারেল হাসপাতাল, রোটারী আই হাসপাতাল, কিরণ পলি ক্লিনিক, আলো হেলথ সেন্টার, দার-উস-শেফা, শাওন ক্লিনিক, আগা ইউসুফ আধুনিক হাসপাতাল, ইসলামিয়া হাসপাতাল, কুষ্টিয়া নার্সিং হোম, দিশা আই কেয়ার, মেডিকেয়ার হাসপাতাল, বৈশাখী ক্লিনিক, ডক্টরস ল্যাব, সেবা প্রাইভেট হাসপাতাল, হরিণারায়নপুর নিউ সেবা ক্লিনিক, ঝাউদিয়া ক্লিনিক, আল হেরা, এফপিএবি, আমিন ষ্পেশালাইজ্ড হসপিটাল ও মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ডায়াবেটিস হাসপাতাল।
মিরপুরে রয়েছে মা ক্লিনিক, নাহার ক্লিনিক, পোড়াদহ, জয়মন ও নাহার নার্সিং হোম। ভেড়ামারায় রয়েছে সাদিয়া ক্লিনিক, ভেড়ামারা নাসিং হোম, আল-হেলাল, দারদী, মাহামুদা, শিল্পী, প্রতীক্ষা নাসিং হোম, নিরাময়, আল-নূর ও হাসিয়ারা ক্লিনিক।
দৌলতপুরে রয়েছে, দৌলতপুর ক্লিনিক, নিউ সেবা, আলহাজ্ব, মডার্ণ, সুপারসনো, কোহিনূর, আরোগ্য লাভ, আল্লাহর দান, মায়ের দোয়া, সিটি প্রাঃ হাসপাতাল, তারাগুনিয়া, জননী নার্সিং হোম, ও হোসেনাবাদ ক্লিনিক।
কুমারখালীতে রয়েছে, পান্টি ক্লিনিক, প্রতীক প্রাইভেট হাসপাতাল, সোমা ক্লিনিক, নোভা ও ফাতেমা ক্লিনিক। খোকসা ক্লিনিক নামে একটি মাত্র ক্লিনিক রয়েছে।
এছাড়াও জেলায় বেশ কিছু লাইসেন্সধারী প্যাথলজিক্যাল ল্যাব রয়েছে। যার মধ্যে সদর উপজেলায় রয়েছে, কাশেম চেম্বার, দি হার্ট সেন্টার, জনসেবা, সনো, আমিন, রেজা, সেবা, পিএসকেএস, মুন, তুলসান, মরিয়ম, ডক্টরস, লালন শাহ, উপমা, পুপুলার, বাহার, মুক্তি, খলিশা কুন্ডি, একতা, গড়াই, ডায়াবেটিক সমিতি, নূরুন নাহার, আদ-দ্বীন, ট্রিটমেন্ট ভিউ, ডাঃ তোফাজ্জেল, দি ইস্টার্ন, শিশু হাসপাতাল, শাপলা, মর্ডান, আকবর, এফপিএবি, ইসলামিয়া, সততা ও ডায়াবেটিস প্যাথলজি। ভেড়ামারায় রয়েছে, সনো, জনসেবা, দি মেডি এইড, আল-আমিন, আল-হেলাল, সন্ধানী, মা ও বিশ্বাস ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। দৌলতপুরে রয়েছে, সুপার সনো, দৌলতপুর ও ইসলামিয়া ডায়াগনষ্টিক সেন্টার।
কুমারখালীতে রয়েছে, সোহাগ, কথা, প্রতীক, নোভা, নিউ মজিদ ও স্নিগ্ধা ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। মিরপুরে সাহাদালী ডায়াগনষ্টিক সেন্টার নামে একটি মাত্র সেন্টার রয়েছে।
পরিবেশ অধিদফতর সূত্র জানায়, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ১১ ধরনের বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এদের মধ্যে ভয়ানক হচ্ছে সংক্রামক বর্জ্য। এগুলো হচ্ছে-রক্ত, পুঁজ, দেহরস দ্বারা সংক্রমিত গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, স্পঞ্জ, সোয়াব, মব, প্লাস্টার, ক্যাথিটার, ড্রেনেজ টিউব, রক্ত সঞ্চালনের ব্যাগ-টিউব, রক্ত দ্বারা সংক্রমিত স্যালাইন সেট, জমাট বাঁধা রক্ত বা দেহরস, ডায়রিয়া রোগীর সংক্রমিত কাপড়-চোপড় এবং সংক্রমিত সিরিঞ্জ।
একই ধরনের ভয়াবহ এনাটমিক্যাল বর্জ্য হচ্ছে-মানব দেহের কেটে ফেলা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, টিস্যু, টিউমার, গর্ভফুল বা গর্ভ সংক্রান্ত বর্জ্য।
আর তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে-রেডি অ্যাকটিভ আইসোটোপ, তেজস্ক্রিয় বস্তু দ্বারা সংক্রমিত সব বর্জ্য, অব্যবহূত এক্সরে মেশিনের হেড ইত্যাদি।
এসব বর্জ্য নিয়ম অনুযায়ী বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে ইনসাইনেরেটরে বিনষ্ট ও শোধন করতে হবে। কিন্ত জেলার এসব রোগনির্ণয় কেন্দ্রগুলোর বর্জ্য বিনষ্ট ব্যবস্থা একবারেই সিমীত।
জেলা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক মালিক সমিতির নেতা রেজাউল করিম বলেন, আমরা ক্লিনিক্যালি ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যগুলো নিজেরাই পুড়িয়ে ফেলি। অন্য বর্জ্য সুইপার দিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়।
এমকে





